প্রেমের নৌকাডুবি – প্রথমখন্ড – পার্থসারথি দত্ত

#প্রথমখন্ড#

সবে ল্যাপটপ খুলেছি “নৌকাডুবি” দেখব বলে। নেট থেকে কোনরকমে ডাউনলোড করলাম। ডাউনলোড স্পিড এতো কম মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যায়। মোবাইল থেকে দেখব বলে কত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। রাত্রি বেলা তো আরও স্লো হয়ে যায়। বিরক্তিকর।
আর্ট ফিল্মে রাইমার অভিনয় টা আমার প্রথম থেকেই ভালো লাগে। প্রথমেই রাইমার লিপে “খেলাঘর বাঁধতে নেমেছি।” গানটা শুনতে শুনতে “আমার মনের ভিতরে” সবে ডুবতে শুরু করেছে “নৌকাডুবি “। ঠিক সেই সময় বেজে উঠল চেনা রিংটোন। ” চেনা মুখ, ছুঁয়ে থাকা দৃষ্টি। এলোমেলো আড্ডা, চায়ের গেলাস্। ঘুম ঘুম ক্লাস রুম, পাশে খোলা জানালা। ডাকছে আমাকে তোমার আকাশ। ” এই সময় আবার কে? এতো রাত্রে? মোবাইল টা আজ একটু দূরেই রেখেছি। না হলে ফেসবুক এর নেশাটা আমাকে আবার সিনেমাটা শেষ করতেই দেবে না। অপু এত রাতে? তাড়াতাড়ি ফোন টাকে রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠল হ্যালো? মৃণাল? হ্যাঁ ।বলছি বলো। শোন না বলছিলাম কি ফেসবুকে গানের লড়াই টা বেশ জমে উঠেছে। শিগগির এসো। খুব মজা হচ্ছে। না অপু। শোন। আমি কিছু শুনতে চাই না। তুমি এসো তাড়াতাড়ি। বলেই হুট করে ফোনটা কেটে দিল। আচ্ছা জ্বালাতন করে তো মেয়ে টা। একে আবার বেশি কিছু বলাও যায় না। মুখ ফুলিয়ে, রাগ দেখিয়ে, যাচ্ছে তাই কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। বড় লোক বাপের অভিমানি মেয়ে। আমাকে কি বাড়ির কাজের লোক পেয়েছে নাকি? যখন যা বলবে শুনতে হবে। সেদিন ওরকম হঠাৎ বিকেল চারটেতে ফোন করে বলে কফি সপে আসতে হবে। আব্দার আর কি? কত করে বললাম শোন অপু আমার পাঁচ টা থেকে টিউশন ক্লাস আছে। সব ছেলে মেয়েরা এসেপড়বে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। দুম করে বলে ফেলল অত শত বুঝি না। আমি অপেক্ষা করছি। তোমাকে আসতে হবে। একদিন তো রাত দুটো তে ফোন করে বাইনা শুরু করে তাকে এত রাত্রে ফোক কিংবা ভাটিয়ালি শোনাতে হবে। মামা বাড়ির আব্দার? ল্যাপিতে তখন “বাহিরের খেলায় ডাকে সে, যাব কি করে” সুরটা ভেসে উঠল। থাক আজ না হয় “নৌকাডুবি”তেই মনঃসংযোগ দিই। অপু কে না হয় পরে মানিয়ে নেওয়া যাবে।
‌ অপুর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ কলেজের নবীন বরন উৎসবে। সেদিন সন্ধ্যায় পটাদা এসেছিলেন আমাদের কলেজে। অনেক গুলো গানের সাথে আমার ভালোলাগার ” তোমায় দিলাম আজ ” গানটা ও গাইলেন। এর পর আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন আমরা কেউ যদি ওনার সাথে গান ধরি। অগত্যা বন্ধুরা সবাই মিলে আমাকে বলির পাঁঠা করল। স্টেজে উঠে আমি আর পটাদা শুরু করলাম “কলঙ্কিনী রাধা “। গান শেষে পটাদার সাথে হাত মেলাতে গিয়ে তাঁর হাতে চিমটি কেটে দিলাম। স্টেজ থেকে নামতে গিয়ে দেখি একটি মেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার সাথে পরিচয় করতে এগিয়ে এসেছে। গানটা নাকি ওর খুব পছন্দের। আর আমি নাকি খুব সুন্দর ভাবে গেয়েছি। ধন্যবাদ বিনিময়ে কথোপকথন শেষ করব হঠাৎ মেয়ে টা বলে বসল একটা অনুরোধ আছে যদি রাখেন? হ্যাঁ অবশ্যই। বলুন কি করতে হবে। না। সেরকম কিছু না। আসলে পটাদার একটা সিগনেচার চাই। এই ডাইরির মধ্যে। হ্যাঁ দিন। বলে ডাইরি আর কলম টা নিলাম ওর হাত থেকে। তারপর কলেজ এ প্রায় মাঝে মধ্যে দেখা হয়। একদিন ক্যান্টিনে বসে টেবিল বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করেছি হঠাৎ মেয়েটি ঢুকল। একটা মিষ্টি হাসি তার মুখে ঝলমল করে উঠলো। আমি হাঁদা বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে বেরিয়েও গেল। সেদিন কলেজ ছুটির পর বাসের অপেক্ষা করছি, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে । দেখি সে বৃষ্টি তে ভিজে ছুটে আসছে। তাকে দেখে আমার আবার হার্টবিট বেড়ে যায়। কাছে দাঁড়িয়ে অভিযোগের সুরে বলল আপনি মোটেও ভালো লোক নন। আমি তো হতচকিত হয়ে পড়লাম। কিন্তু কেন? মেয়েদের দেখে একটা সাইলেন্ট স্মাইল দিতে হয় সেটুকুও জানেন না। যাক বাবা ধড়ে প্রান এলো। আমি মাথা চুলকে বললাম হবে হয়তো। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে আমি সত্যিই খুব ভয় পেতাম। ঠিক ভয় না। আড়ষ্টতা বলতে পারেন। অপুর জন্যই অনেক টা সাবলীল হয়েছি। কথোপকথনের মাঝে নিজেদের পরিচয় হলো। আমি অপু মানে অপরাজিতা চ্যাটার্জি। ও। আমি…..। থাক আর বলতে হবে না। আপনি মৃণাল সেনগুপ্ত। হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে? জানতে হয় মশাই। আপনি বাংলা অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আমি ফার্স্ট ইয়ার। বাংলা অনার্স। ও আপনিও বাংলা অনার্স? হ্যাঁ। যাক তাহলে সাহিত্য রসের অভাব হবে না? হ্যাঁ। পুরো রসগোল্লা। ও, বুঝলাম। তা কোলকাতার রসগোল্লার নাম আগে শুনেছি…… আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে উঠল কোলকাতার রসগোল্লা নই মশাই ভোলা ময়রার রসগোল্লা। দুজনে একসাথে হেসে উঠলাম।
‌ সেদিন প্রথম কলেজ কাট করে দুজনে মিলে সিনেমা দেখতে গেছি। ওই দুটো টিকিট কেটে এনেছিল। এই প্রথম দুজনে খুব পাশাপাশি। আজ প্রথম হাতধরে হাঁটা। সিনেমা দেখতে দেখতে হাতে হাত রাখা। ভালোবাসার প্রথম স্পর্শ। আমি চোরা বালিতে তলিয়ে যাচ্ছি। খুব ভয় করছে আমার, ঠিক ঠাক তল খুঁজে পাব তো? আমি ওর হাতটা খুব আলতো করে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কি হচ্ছে? ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখে চোখ রেখে অনেক না বলা কথা বলে দেওয়ার চেষ্টা করল ।সেদিন রাত্রে আমি ঘুমোতে পারিনি।জীবনে কখনো দু নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না। আমার লক্ষ্য, আমার ভবিষ্যৎ আলাদা। আমি টিউশন পড়িয়ে কয়েকটা টাকা রোজগার করে সংসার চালাই সাথে নিজের পড়াশোনা। আর ও বড়লোক বাড়ির মেয়ে। এসব কথা ও কোন মতেই শুনতে চাই না। বুঝতে চাই না আমরা দুজন ভিন্ন মেরুর। অভাবের সংসারে ভালোবাসার জায়গা হয় না। তার বাবা হয়তো মনে মনে কোন রাজপুত্রের সন্ধান করছেন। ভিখিরি হয়ে সে রাজপ্রাসাদে ঢোকার দুঃসাহস দেখানোর ইচ্ছে আমার নেই।
‌ সেদিন অনেকক্ষণ পার্কে বসে ছিল দুজনে।অপুই জোর করে ফোন করে ডেকে এনেছে মৃনাল কে। ইদানিং মৃনাল খুব এড়িয়ে চলছে। আগের মত সে আর নেই। কি যেন হয়েছে তার। হঠাৎ কেমন করে সে যেন পাল্টে গেছে। অপু তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে তোমার? কৈ কিছু না তো। না বললেই হলো। আমাকে বলো প্লিজ। কি যেন একটা অপরাধ বোধ কাজ করছে তার । আজ অপুর চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই। শেষ পর্যন্ত মনে জোর এনে বলেই ফেলল। শোন অপু মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে বা দেখাতে আমি পছন্দ করি না। আমার বর্তমান বা ভবিষ্যৎ তুমি খুব ভালো করেই জানো। শুধু তাই নয়, আমি কিন্তু কখনো তোমার যোগ্যও নই। আমার ইচ্ছে গান বাজনা বা গ্রাজুয়েট হওয়া নয়। আমি চাই ডিফেন্স লাইনে যুক্ত হতে। দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছে আমার ছোট থেকে। আমার জীবনের সাথে নিজের জীবন টাকে জড়িয়ে অভিশপ্ত করে ফেলোনা। তাতে কি? আমি কি তোমাকে বারন করেছি? তোমার স্বপ্ন, সে তো আমার ই স্বপ্ন। আহ্। কি যা তা বলছ? হ্যাঁ ঠিক ই বলছি।
‌ ছোট থেকেই মৃনালের ইচ্ছে ছিল ডিফেন্স এ যুক্ত হওয়া। দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছে তাকে খুব নাড়া দেয়। আর তাই কলেজ আর টিউশন এর ফাঁকে সে ফর্ম ভরতো ডিফেন্স এর। সকাল সন্ধ্যা দুবেলা নিয়মিত মাঠে যেত। নিয়মিত শরীর চর্চা করতো। কয়েক বার লাইনে গিয়ে ঘুরেও এসেছে। কখনো সময়ে মাঠ কমপ্লিট করতে পারে নি। তো কখনো বুকের ছাতির জন্য বাদ পড়তে হয়েছে। কিন্তু সেদিকে ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। চেষ্টার কসুর করে না। আর্মি হওয়ার নেশাটা তাকে পেয়ে বসেছে। খুব শীঘ্রই একটা লাইন আছে। এবার তাকে কোয়ালিফাইড করতেই হবে।
‌ না। এবার তার পরিশ্রমটা বিফলে যায়নি। এবার খুব ভালোভাবেই নিজের যায়গাটা পাকাপাকি করে নিয়েছে। আজ জয়েনিং লেটার হাতে পাওয়ার পর তার খুব আনন্দ হচ্ছে। যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। দেশের সেবাই নিজেকে উৎসর্গ করার আনন্দ। আজ খুব ইচ্ছে করছে পুরো গ্রাম, মাঠ ঘাট, বনের মধ্যে সেই খুশিটাকে ছড়িয়ে দিতে। তার টিউশন এর ছেলে মেয়ে দের মিষ্টি খাইয়েছে। আজ তার চোখ ভিজে আসছে বারবার। এই ছোট ছোট মুখ গুলো বারবার ভেসে উঠছে তার চোখে।আর তো তাদের প্রতি দিন দেখতে পাবে না। তাদের চিৎকার, চেঁচামেচি, হৈ হুল্লোড়। কোন কিছুই আর ফিরে আসবে না। মনে পড়ছে তাদের নিয়ে পার করে আসা অনেক সুখ স্মৃতি। মনে পড়ছে বিকেলের ফুটবল। চায়ের দোকানের আড্ডা। আর সেই গ্রামের মানুষ গুলোর কথা। যাদের সময় অসময় পাশে দাঁড়িয়েছে। যাদের কোন কিছু হলে রাত্রেও ছুটে বেরিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ভরসা যুগিয়েছে। নিজের যৎসামান্য উপার্জনের কিছু তাদের জন্য বিলিয়ে দিয়েছে। যে গ্রাম ছেড়ে সে একটা দিন ও বাইরে কাটায় নি, সেই গ্রাম ছেড়ে তিন মাস? পুনেতে তার ট্রেনিং। এই তিন মাস তাই সব কিছুই তাকে ভুলে যেতে হবে।
‌চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of