প্রেমের নৌকাডুবি – মধ্যাংশ – পার্থসারথি দত্ত

#মধ্যাংশ#

অপু মেয়ে টা কে এখনও ঠিক ঠাক বুঝে উঠতে পারেনি মৃণাল। খবর টা পেয়ে অপুই ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছে। পার্কে বসে একগুচ্ছ ফুল দিয়ে সে বলেছিলো , যাও যুদ্ধে জয়ী হয়ে এসো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। অপেক্ষা করব দেশের সেবাই উৎসর্গ করা সেই মানুষ টির জন্য। দেশ বাঁচাতে সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রহরীর জন্য। যার শরীরের পারফিউমের গন্ধ নয়, ঘামের গন্ধটা আমার খুব প্রিয় লাগবে। যার শরীর এর উর্দিটা আমার মত অনেক নারীর অলংকার হয়ে থাকবে। মনে মনে অপুর জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল। হায় রে ভারতীয় নারী, তোমাদের এই আত্মত্যাগ মানুষ ভুলে যায় কেমন করে? নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষটা কে এতদূরে রেখে যে নারীরা দুশ্চিন্তায় প্রহর গোনে, তার হিসেব আমরা আর কতটুকুই বা রাখতে পারি।
তিন মাসের ট্রেনিং তার শেষ হয়েছে। আজ তাই আনন্দে আত্মহারা সে। বুকের ভেতর বাজছে তার ঘরে ফেরার গান। অপুর সেই হাসি মাখা মুখ খানি দেখার জন্য সে ব্যকুল। আজ তার মুখ খানি বারবার ভেসে উঠছে মনের মধ্যে। এক সাথে পার করা সুন্দর মুহূর্ত গুলো বারবার তার চোখে ভিড় করে আসছে। মনে পড়ছে গ্রামের মানুষ গুলোর কথা, মাটির গন্ধটা।কানে বাজছে সন্ধ্যায় মন্দিরের আরতির ঘন্টার শব্দ। সন্ধ্যা প্রদীপ, শাঁখের আওয়াজ। আর তাই ফেলে আসা দিন গুলো কে এক সুতোই গাঁথতে চেষ্টা করছে সে। ট্রেনিং এর এই তিন মাস তাদের কাছে ফোন ও রাখতে দেওয়া হয় না। সপ্তাহে শুধু মাত্র একটা দিন বাড়ির সাথে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় অফিসের ফোন থেকে। কিন্তু সেখানেও এতো ভিড় যে বাড়ির সাথেই ঠিক ঠাক কথা হয় না।আজ তিন মাস কোন যোগাযোগ নেই অপুর সঙ্গে। জানেনা কেমন আছে সে। এতদিনের প্রতিক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে।সময় যত পার হচ্ছে ততই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। আর তো মাত্র একটা স্টেশন, তার পরেই তাকে নামতে হবে। ট্রেনের সিটে বসে থাকতে পারছে না। বারবার উঠে গেটের সামনে চলে আসছে। তাকিয়ে দেখছে বাইরের জগৎ টার দিকে। কি মোহময় শান্তি গ্রামের বাতাসে। এক বুক নিঃশ্বাস টেনে মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা অনেক হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে কাটা দগদগে ঘা এর ওপর শান্তির প্রলেপ লাগলো। স্টেশনে নেমে খুঁজতে থাকে চেনা মুখ গুলো। বিপিন, অজিত, নিখিল সবাই এসেছে। আবেগ টা আজ চোখ চীরে বেরিয়ে আসছে।
খুব কাছাকাছি তারা দুজন। কিন্তু নিস্তব্ধ। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। খুঁজে পাচ্ছে না কোথা থেকে শুরু করবে। সন্ধ্যার আকাশে চৈতালি চাঁদ। কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে আলো এসে পড়ছে অপুর মুখে। অনেক দিন আগে কোন এক পড়ন্ত বিকেলে এই গাছের ওপরে নিজেদের নাম লিখে রেখেছিল দুজনে। আজ সেই গাছের গায়ে হাত দিয়ে সেটাই খুঁজছে। এত কথা বলার ছিল, কোথায় হারালো সব? আজ অপুর মুখে হাসি নেই। এ মুখ তার অচেনা। এত গম্ভীর মুখে কোন দিন সে অপুকে দেখেনি। আজ কেন বাতাস বইছে না? হঠাৎ অপু তাকে জড়িয়ে ধরল। বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে কি যেন খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। এতক্ষণ ধরে ভারি হয়ে থাকা বুকের ভেতর টা একটু হাল্কা লাগছে। গুমোট পরিবেশ যেন বাতাসের হাওয়াই ফুরফুরে মেজাজে ফিরে এলো। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোন ভাষা লাগে না। ভালোবাসার মানুষ টার চোখের দিকে তাকিয়ে মেপে নেওয়া যায় তার গভীরতা। তার মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ে ফেলা যায় প্রেমের পদ্য গুলো। অপুর মুখ খানি মৃনালের হাতে। আবেগে বুজে গেছে চোখ। তিরতির করে কেঁপে উঠছে তার ঠোঁট। আকাশের চাঁদ টাও লজ্জিত হয়ে ঢেকে গেল সাদাকালো মেঘের ভেতরে।
এভাবেই কেটে গেল অনেক গুলো দিন। এবার তাকে ডিউটিতে ফিরে যেতে হবে। তার প্রথম পোস্টিংই কাশ্মীরে। ভারতের এই শীতল বরফের জায়গাটা বহিরাগত শত্রুর সঙ্গে লড়াই এ জেরবার।
উরি কিংবা পাঠানকোটের মতো ঘটনা যে কোন সময় ঘটে যাওয়া আকস্মিক কিছু নয়। সন্ধ্যা বেলা স্টেশনে সব বন্ধুরাই ছাড়তে এসেছিল মৃণাল কে।গ্রাম থেকে দিল্লি ও দিল্লি থেকে শ্রীনগর হয়ে পৌঁছানো হল কাশ্মীর এর আর্মি ক্যাম্প এর ভেতর।
কাশ্মীর না বলে এটাকে স্বর্গ বললেই মনে হয় ভালো হয় । আর তাই এই স্বর্গরাজ্য দখলের জন্য বারবার চেষ্টা করে অসুরের দল। আর সেই অসুরদের নিধন করতে যুগে যুগে অবতীর্ণ হন ভগবান। হ্যাঁ। ভগবান ই তো। সেই ভগবান আর শত্রুর লড়াই হয় এই যুদ্ধ ভূমিতে। ভারতের বীর সেনাবাহিনীর রক্তে ভিজে যায় পুণ্য ভূমি। তবু তাঁরা অঙ্গীকার বদ্ধ দেশ বাঁচাতে। তাঁদের শক্ত চোয়াল, গ্রন্থীল পেশী আর নির্ভীক বুকের ভেতরে বাজতে থাকে,”বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী। ”

মাটির থেকে সাতশো আটশো ফুট ওপরে।এখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাইনাস দশ কি বার। সাদা বরফের চাদরে ঢাকা কাশ্মীরের পাহাড়। গাছের ডাল, পাতা সমস্তই বরফে ঢাকা। প্রকৃতির অকৃপনতায় সৌন্দর্যের পশরা সাজিয়ে বসে আছে কাশ্মীর।
‌ কাজের চাপ এখানে ভালোই। হাতে মোবাইল ফোন থাকলেও নেটওয়ার্ক ঠিক ঠাক পাওয়া যায় না। তাছাড়া কখন কোথায় ডিউটি করতে হবে কেউ যানে না। এরই মাঝে কখনো কখনো খবরাখবর নেয়। অপুর সাথে অনেক দিন কথা হয় নি। কি হয়েছে তার কে জানে। বিপিন, অজিতের কাছে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তারা কেউই তার খবর দিতে পারে নি। নিখিল শুধু একবার বলেছিল আজকাল খুব একটা বাইরে বেরোয় না। কলেজেও আসে না। কারও সাথেই আর যোগাযোগ করে না। মৃণাল এবার পূজোর ছুটি পায় নি। প্রথম পোস্টিং তাই ছয় মাসের আগে ছুটি পাওয়া খুব কঠিন। আগে থেকেই তাই নভেম্বর মাসে ছুটির দরখাস্ত করে রেখেছে। শীত কালটা অবশ্য ঘরে কাটানো যাবে। মাঝে মাঝে অপুর জন্য খুব চিন্তা হয় তার। খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অনেক ভাবেই খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু কোন চেষ্টাই তার সফল হয় নি।
ছুটি তার মঞ্জুর হয়েছে। তাই আজ আবার ঘরে ফেরা। কিন্তু কেন জানি না আজ একটা অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। কোথায় যেন একটা ভয়। হ্যাঁ ভয় ই। প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয়। আজ তার মন বড় চঞ্চল হয়ে উঠেছে। জানি না কি অপেক্ষা করছে তার জন্য। জানেনা কেমন আছে তার অপু। আজ বারবার তার ফোন ট্রায় করে যাচ্ছে। কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। বিপিন কি কিছু লুকিয়ে যাচ্ছে। সে শুধু ফোন তুলে বলল, ও তুই আজ আসছিস? আয়। কোথায় যেন সুর কেটে যাচ্ছে। কেমন উদাস হয়ে গেছে মৃণাল। সময় যেন কাটতে চাইছে না। কি হয়েছে তাদের? সব ঠিক আছে তো?
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে বাড়ি পৌঁছানো। আজ এতো সকালে কেউ ই আসেনি স্টেশন এ। মস্ত একটা কাঠের বাক্স একা নামাতে হলো ট্রেন থেকে। তার পর এক টোটো ডেকে তার মধ্যে বসিয়ে বাড়ি ফিরছে। কি আছে দাদা এই বাক্সে? তোমার রাইফেল? বন্দুক? না রে বোকা এতে আপেল আছে। কাশ্মীরের আপেলের নাম শুনিস নি? ও এবার বুঝলাম। আচ্ছা যাদু বাড়িতে সবাই কেমন আছে রে? ভালো। কেন দাদা? না এমনই জিজ্ঞেস করলাম। গ্রামের সবাই কেমন আছে? বিপিন, অজিত, নিখিল সবাই ভালো আছে তো? হ্যাঁ দাদা, সবাই খুব ভালো আছে। ও আচ্ছা। আচ্ছা শোন তুই বাজারের ভিড় এ না ঢুকে বামুন পাড়ার রাস্তা দিয়ে চল। ঠিক আছে দাদা। ইচ্ছে করেই বামুন পাড়ার রাস্তা দিয়ে ঢুকল মৃণাল। যদি অপুর সঙ্গে দেখা হয়। যদি সে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে তার আশায়। তার আসার খবর নিশ্চয়ই পেয়েছে, বিপিন-অজিত এর কাছে। দূর থেকে হঠাৎ চোখে পড়ল অপুদের বাড়িতে বিয়ের প্যান্ডল। বাইরের চোখ ধাঁধানো শৌখিন গেট। কার বিয়ে রে? ও আমাদের অপুদিদির গো। তুমি জানতে না। ছেলে টা খুব বড় ডাক্তার।বিদেশে থাকে। আর কোন কথা কানে ঢুকছে না। মাথার উপর ভেঙে পড়ল আকাশ। এক লহমায় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল সব স্বপ্ন, সব আশা। বাড়ির বাইরে বরের গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা। অনেক ভিড় তাই টোটো টা দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু দাঁড়াতে হবে দাদা। মনে হচ্ছে কনে বিদায় হচ্ছে। ঝাপসা চোখে চোখাচোখি হলো দুজনের। অব্যক্ত যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠছে তার হৃৎপিণ্ড। চোখ দিয়ে ঠিকরে বেরোচ্ছে জলন্ত আগ্নেয় গিরির লাভা
।বুঝতে পারছেনা সে কি করবে, অপু যে এই ভাবে তার বিশ্বাস নিয়ে খেলবে এটা ভাবতেই তার গা শিউরে উঠছে ।একজন যখন খেলাঘর গড়ার স্বপ্নে বিভোর অন্য জন তখন খেলাঘর ভাঙ্গার যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে তার মুখ। সিঁথিতে সিঁদুর আর লাল বেনারসি শাড়ি তে কি সুন্দর মানিয়েছে তাকে।
কিন্তু সব সৌন্দর্য তো সবার জন্য নয়।সৌন্দর্য চোখ দিয়ে দেখা যায়। কিন্তু উপভোগ করার জন্য লাগে অন্তরাত্মা। সেই অন্তরাত্মার হৃদয়াকাশে আজ কালো মেঘের ঘনঘটা। ভেতর থেকে গুরু গুরু শব্দ আর বিদ্যুতের শানিত ফলায় শতছিন্ন তার মন।

‌চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of