হিরোশিমা – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta

# হিরোশিমা #

প্রকৃতির রোষে ঘটে সুনামি
কিংবা কয়েক সেকেন্ড এর কম্পনে
নড়ে ওঠে গুজরাট।
প্রানের সমাধির বেদির উপর,
গড়ে ওঠে আশার সভ্যতা।
তবু ও সৃষ্টিরা থেমে থাকে না।
সৃষ্টিরা থমকে যায় পৈশাচিক উল্লাসের কাছে,
ঠান্ডা ঘরের মধ্যে আলো আঁধারির পরিবেশে
বাতাসে ওড়ে শ্যাম্পনের ফোয়ারা।
খেলা চলে যুদ্ধ যুদ্ধ।
মনুষ্যত্বের ফেরিওয়ালারা
ক্ষমতার জয়গান গেয়ে আলিঙ্গনে লিপ্ত হয়।
আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের লাশ
শুয়ে আছে, বিশ্ব মানবতার হৃদয়ে।
বুকের পাড়ায় হামাগুড়ি দিয়ে
উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে ক্ষুদ্র মানবতা।
দানবের রোষে যদি ঘটে কোন
ধ্বংসের খেলা।
সেখানে নতুন করে জেগে ওঠে না
আর কোন প্রানের সভ্যতা।
ইতিহাস তৈরি হয় নির্মমতার।
আর তার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
ওলিয়েন্ডার ফুল।

– পার্থসারথি দত্ত

অনাহারে রাজধানীর বুকে শিশু মৃত্যু – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta
পার্থসারথি দত্ত

খোদ রাজধানীর বুকে একই পরিবারের তিন শিশুর মৃত্যু অবাক করে দেয়। মনে করিয়ে দেয় আমলাসোলের ঘটনা। ভাবতে খুব অবাক লাগে স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা পারিনি ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে। আজও অপুষ্টির শিকার বহু মানুষ। পথশিশুদের খাবার খেতে হয় কুকুরের সাথে লড়াই করে। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্টে ভাগ বসাতে হয় তাদের। মুষ্টিমেয় শিল্পপতিদের ঘরে জমছে কালো টাকার পাহাড়। যে দেশে রাজনীতিবিদদের দেশ চালাতে হয় না। দেশ চলে শিল্পপতিদের অঙ্গুলিহেলনে সেই দেশে এর চেয়ে বেশি আর কিই বা আশা করা যায়? তাতে করে কয়েক টা নর্দমার কীট মারা গেলে কার কি যায় আসে?
মনুষ্যত্ব বিক্রি করেছি,
বিবেক গিয়েছি ভুলে
পিঠের চামড়া খুলে দিতে রাজি,
জুতো বানানোর হলে।
কিবা যায় আসে, পথশিশু ম’লে?
ওরা তো আবর্জনা,
হাজার মরলে সরকারি মতে
হবে সেটা হাতে গোনা।
দেশ ডিজিটাল করতেই হবে,
আটা নয় দাও ডেটা।
হাসি মুখে এসে গিন্নী কে বলি ,
ভালো কাজ করে বেটা।
খাদ্যে যা টুকু ভুর্তকি দেয়,
অর্ধেক যায় চুরি।
গরীবের ভাগে কানাকড়ি জোটে,
রাজাদের বাড়ে ভূঁড়ি।
আমি তো আবার বিদ্রোহ করি
ফেসবুকে করি চিৎকার,
লাইক, কমেন্ট, হাততালি দিয়ে
কেউ বলে ধিক্ ধিক্কার।
কাজের কাজ তো কিছুই করি না
দু কলম লেখা ছাড়া।
কি করে করব? দুর্বল মোরা
নুয়ে গেছে শিরদাঁড়া।
ছাপোষা মানুষ বিদ্রোহ করে
শুধু শুধু জেল ঘোরা
ভীরু কাপুরুষ তকমা লাগুক
তবু সুখী আছি মোরা।

– পার্থসারথি দত্ত

যদি চলে যায় – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta
পার্থসারথি দত্ত

যদি চলে যায় কোনদিন
পৃথিবীর এই ধুলোমাটি পথ ছেড়ে,
যদি মরন আসে কভু,
তোর কাছ থেকে আমাকেই নিতে কেড়ে।

পারবি সেদিন আগলে রাখতে মোরে?
পারবি, সেদিন বাঁধতে সে ফুলডোরে?
যে ফুল দিয়ে মালা গেঁথেছিনু ওরে
আজ সেই মালা ধুলায় লুটাই যেরে।

সে মালায় ছিল হাজার তারার আলো
রামধনু রং ভিড় করেছিল তাতে।
আর ছিল তাতে অনেক স্বপ্ন আঁকা
যে স্বপ্ন মোরা দেখেছিনু একই সাথে।

আজ তা মলিন, সবই হোল শেষ যে রে,
পারবি কি আর বাঁধতে সে ফুলডোরে?

– পার্থসারথি দত্ত

GBS’এর ৩ বন্ধু… on the top of the hill – শুভ্রজিত মুদি

Amit, Subhrajit, Partha
Subhrajit Mudi
শুভ্রজিত মুদি
Amit, Subhrajit, Partha
Amit, Subhrajit, Partha

GBS শুধু একটা গ্রুপের নাম নয় আমার রোজের জীবনে আর পাঁচটি গুরুত্বপুর্ণ কাজের মতোই সমান গুরুত্বের অঙ্গ হয়ে গেছে । স্বজাতী প্রেম এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার একটা সহজ পাঠ পেয়েছি এই গ্রুপের হাত ধরেই । অনেক বন্ধু পেয়েছি, অনেক অভিভাবক পেয়েছি যারা তাদের মহানুভবতায় আমাকে আকৃষ্ট করেছে । এমনি ভাবেই হঠাৎ পরিচিত হয়েছি পার্থদার সাথেও । বহু আখাঙ্খিত সাক্ষাৎ ঘটল আজ তার সাথে । রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্বেও কেমন যেন আপন মনে হল । তার ছবি দেখেছি, আর সেই দেখার উপর বিশ্বাস করেই চলন্ত টোটো থেকে ভীড় বাজারে দাড়িয়ে থাকা কর্মব্যাস্ত পার্থদাকে চিনে নিতে অসুবিধে হয় নি । তার বাড়ি যাই, আতীথেয়তা আর সৌজন্য বোধের প্রতিমুর্তী সে এবং তার পরিবার । জ্যাঠিমা ছিলেন বাড়িতে । খুব ভালো মানুষ তিনি । তারপর পার্থদা তার কর্মচারিদের একা ছেড়ে সব ব্যস্ততা দুরে সরিয়ে আমাদের পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা ঝালদা (23.3283° N, 86.2336° E) শহরের সাথে পরিচয় করায় । খুব সুন্দর, গোছানো শহর । ধন্যবাদ পার্থদা । ধন্যবাদ GBS

–শুভ্রজিত মুদি

 

 

 

অন্তহীন – তৃতীয় পর্ব – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta
পার্থসারথি দত্ত

➡ ➡ (…“অন্তহীন – ১ম পর্ব” পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন )

➡ ➡ (…“অন্তহীন – দ্বিতীয় পর্ব” পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন )

বড় গেট পেরিয়ে গাড়ি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। দুপাশে সুন্দর করে সাজানো বাগান। ফুল গাছ গুলি সুন্দর সুন্দর ফুলে ভরে আছে। আমারা যখন বাড়িতে ঢুকি কাকাবাবু তখন গাছগুলি তে জল দিচ্ছিলেন। গাছেদের পরিচর্যা ছেড়ে উনি চলে এলেন আমার কাছে। যেন কতদিনের চেনা। কত আপন সবাই। আমাদের উপরের ঘরে বসতে বলে আবার বাগানের দিকে গেলেন। আমি আর রাজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। একটা সুন্দর রবীন্দ্র সঙ্গীতের আওয়াজ ভেসে আসছে।রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে একটা আলাদা মাধুর্য আছে। যতবারই শুনি ততবার সেই মানুষটার প্রেমে পড়ে যায়। “সে চলে গেল, বলে গেল না। সে কোথায় গেল, ফিরে এলো না।” বাহ্, বেশ সুন্দর গান টা। কে চালিয়েছে রে? হঠাৎ একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম রাজার চোখে মুখে। এতক্ষণের প্রাণবন্ত উচ্ছল মানুষ টা হঠাৎ করে শামুকের মতো গুটিয়ে গেল কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম কি রে ঠিক আছিস তো? শরীর খারাপ লাগছে? না বলে প্রত্যুত্তর দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। অগত্যা আমি ও আর কথা না বাড়িয়ে ওর পিছনে পিছনে উঠতে শুরু করলাম। উপরে উঠে রাজা একজন কে দেখিয়ে বললো এ আমার বোন। আমি হতবাক হয়ে গেলাম। ওর রুমের ভেতর থেকেই আসছে গানের আওয়াজ টা। দেখে মনে হল বদ্ধ উন্মাদ। উসকো খুসকো চুল। শরীরে আলুথালু বেশ। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বাড়ির সিলিং এর দিকে। যেন এক চাতকির দৃষ্টি। আকাশের বৃষ্টির জন্য তাকিয়ে প্রতিক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সিলিং এ একটা ছোট্ট মাকড়সা তার জালের মধ্যে আপন মনে খেলা শুরু করেছে। হয়তো সেটাই দেখছে সে। চোখের কোনে কালি পড়েছে।মুখ দেখে সত্যিই খুব মায়া লাগছে।বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ। রাজা আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি চমকে উঠলাম। পরক্ষণেই পিছন ফিরে দেখি রাজার চোখ দুটো জলে ভিজে গেছে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছি না। অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছি।ভাষা পাচ্ছি না। ঠিক বুঝতে পারছি না কোথা থেকে শুরু করবো। কিই বা জিজ্ঞেস করব। ও ইশারাই ডেকে ফাঁকা ছাদের উপর গিয়ে দাঁড়ালো। আমি ও এলাম। সূর্যের শেষ আলো আস্তে আস্তে গিলে ফেলছে অন্ধকার। পশ্চিমাকাশ তখন ও আবীরে রাঙা। বিষন্নতায় ভরা সাঁঝের বাতাস। এখনও দুএকটা ঘুড়ি পতপত করে উড়ছে আকাশে। আমি নির্বাক চলচ্চিত্রের মতো দাঁড়িয়ে আছি।
কিছু বলবো ভাবছি। কিন্তু আমাকে আটকে দিয়ে ওই শুরু করলো। আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগের কথা। তখন ও মাধ্যমিক পাশ করে ইলেভেন ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনাই খুব ভালো ছিল পৃথা। আর সাথে গানের গলা ছিল অসাধারণ। এখানকার হাই স্কুলেই পড়াশোনা করত।সরস্বতী পুজোর দিন ও আর জয়ন্ত একই সঙ্গে “কোলাজ” নাটকে অভিনয় করে। ওর মুখ থেকে শুনতে শুনতে আমার চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ভেসে উঠল দিন গুলি।
মাসি- “আচ্ছা আদিত্য তোর সিরাজের অভিনয় টা মনে আছে?
আদিত্য – হ্যাঁ মাসি, মনে আছে। আচ্ছা মাসি তোমার স্টার থিয়েটারের অভিনয় টা মনে পড়ে? কি যেন, কি যেন রোলটা ছিল?
মাসি – সুভাষ বোস।
আদিত্য – হ্যাঁ। হ্যাঁ মাসি আমি সেই সুভাষ বলছি,” তোমারা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো ”
সুপ্রিয়া – আদিত্য দা?
আদিত্য – কে? গলাটা চেনা চেনা লাগছে।
সুপ্রিয়া – আমি সুপ্রিয়া
আদিত্য – এসো এসো সুপ্রিয়া
সুপ্রিয়া – এখন আমি পথের ভিখারিনী, খেতে পাইনি।
আদিত্য – শোন সুপ্রিয়া, শিল্পীর কদর এ বাংলা দিতে পারলো কৈ।
সুপ্রিয়া – অভিনয় করে সারা জীবন কাটালাম। কিন্তু জীবনের শেষ বেলায় এসে, একটু শান্তি পেলাম না। উঃ বড় কষ্ট হয়।
আদিত্য – শোন সুপ্রিয়া, ঐ দূর থেকে ভেসে আসছে গানের সুর। ”
” ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু। পথে যদি পিছিয়ে, পিছিয়ে পড়ি কভু। ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু।”

✍️✍️ চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…✍️✍️

–পার্থসারথি দত্ত

শুধু একবার বলো – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta

পার্থসারথি দত্ত

শুধু একবার বলো ভালোবাসি
শুধু একবার বলো কাছে চাও
শুধু একবার বলো প্রিয়তম
কাছে এসে দু হাত বাড়াও।
আমারে জড়িয়ে ধরে বল
হৃদয়ের সব কথা আজ,
আমি শুধু চোখে চোখ রেখে
দেখে নেব মুখে রাঙা লাজ।
বাতাস কে বলি থেমে যাও
এসেছে আমার কাছে প্রিয়া
চাঁদ কে বলবো ডুবে যাও
জুড়াক এ ব্যাকুল হিয়া।
আজকে মোদের গোপন অভিসার
সেকথা জানব শুধু তুমি আর আমি,
আজকে খুশির বাঁধ ভেঙে যেতে দাও
বেরিয়ে আসুক আমাদের পাগলামি।
আজকে শুধুই কথা হবে দুজনার
চোখে চোখ রেখে হারাতে চাইছে মন
যত ঢেউই আজ উঠুক সাগর জলে
তীরেতে সাজানো প্রেমের বৃন্দাবন।
ডুবে যেতে দাও আকাশের যত তারা
উঠুক জ্বলে তোমার নয়ন দুটি
ঠোঁটে ঠোঁট রেখে অধিকার বুঝে নেব
আজকে কিন্তু চাইলে পাবে না ছুটি।
প্রেম যদি আজ ঢেউ তুলে নদী বুকে
ডুবে যেতে দাও আমাদের ছোট তরী
তার চেয়ে চলো আমরা দুজন মিলে
পৃথিবীর কোনে আজ খেলা ঘর গড়ি।

–পার্থসারথি দত্ত

অন্তহীন – দ্বিতীয় পর্ব – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta
পার্থসারথি দত্ত

➡ ➡ (…“অন্তহীন – ১ম পর্ব” পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন )

দ্বিতীয় পর্ব:
রাজা অনেক বার আমাকে ওদের বাড়ি যেতে বলেছে। কিন্তু সত্যি বলতে কি সময় করে উঠতে পারিনি। বারবার না বলতে কোথাও যেন নিজের বিবেকে বাধে। তাই আজ ঠিক করেই রেখেছি ওদের বাড়ি যাব। ওদের বাড়ি সিরকাবাদ গ্রামে। অযোধ্যা পাহাড়ের ঠিক উল্টো দিকে। পাহাড় ডিঙিয়ে পৌঁছতে হয় ওদের গ্রামে।
বর্ষা শেষ হয়ে শরতের আকাশ মেঘমুক্ত। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ আলোয় ধৌত প্রকৃতি।পথের দু’ধারে কাশফুল গুলি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আমন ধানের ক্ষেতের উপর লুটিয়ে পড়ছে হাওয়া। একটা পাখির মিষ্টি ডাক শুনে হঠাৎ গাড়ি থেকে নামলাম। রাজা কে জিজ্ঞেস করে জানলাম এটা পিউকাহা পাখির ডাক। নাম না জানা আরও কিছু পাখির আওয়াজ ধ্বনিত হচ্ছে বিকেলের পরিবেশে । হলুদ সবুজ প্রজাপতির ইচ্ছে হাওয়ায় গা ভাসানো। গ্রামের মহিলারা মাথায় ভারি ভারি কাঠের বোঝা নিয়ে নামছে পাহাড়ের গা বেয়ে। ছাগলের পাল নিয়ে পাহাড়ের পথ ধরে নামছে মাঝ বয়সি একজন মানুষ ও মহিলা। মানুষটি বেঁটে হাইট, কালো ছিপছিপে গড়ন, শরীরে লুঙ্গি ও বড় হাতওয়ালা গেঞ্জি। ছোট বড় ছিদ্র দিয়ে ভেতরের বুকের কিছু অংশ চোখে পড়ছে । কাঁধের উপর মস্ত কাঠের ছাতা আর মাথার উপর গামছা জড়ানো। রাজা কে দেখে একগাল হেসে বললেন, “খুঁড়া ঘর চললে ন কি ব?” মুখে কাঁচা পাকা দাঁড়ি, হলদে হয়ে যাওয়া দাঁতের ফাঁকে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদের হাসির রেখা। রাজা উত্তর দিল হ্যাঁ বলে। “আর তোর সাথে ইটা কে বঠে”? রাজা পরিচয় করিয়ে দেয় আমার সাথে বলে এটা আমাদের হাসপাতালের নতুন ডাক্তার বাবু। কোলকাতা থেকে এসেছে। ভদ্রলোক হাত দুটো জড়ো করে পননাম ডাকতার বাবু বলে উঠলেন । আমি প্রতি নমস্কার জানালাম। কিন্তু নিজের ই খারাপ লাগছিল।আসলে প্রণাম শব্দ টা খুব অপরাধী করে তোলে আমাকে। আমি ওনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার গাড়ি স্টার্ট দিলাম।
পাক খেতে খেতে আমাদের গাড়ি উঠছে অযোধ্যা পাহাড়ের উপরে। অযোধ্যা পাহাড়ের গায়ে দুটো ড্যাম। একটা পাহাড়ের মাঝ বরাবর যেটা লোয়ার ড্যাম আর একটা সবার উপরে যেটা আপার ড্যাম। যেদিকে তাকাই এক অদ্ভুত মোহময়তা আমাকে মুগ্ধ করে দেয়। নাম না জানা ফুল গুলো সুন্দরী অযোধ্যার শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই আপার ড্যাম পেরিয়ে পাহাড়ের উপর গ্রাম গুলো দেখতে দেখতে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছি। পাহাড়ের থেকে নীচে নামতে নামতে দেখছি ভুট্টা আর আঁখের ক্ষেত। সবুজের হিল্লোলে চোখ জুড়িয়ে ওদের বাড়িতে পৌঁছলাম।

✍️✍️চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…✍️✍️

–পার্থসারথি দত্ত

খুঁজে দেখো – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta

পার্থসারথি দত্ত

খুঁজে দেখো
জানি তুমি চলে গেছো দূরে
স্মৃতিটুকু ফেলেছো কি মুছে?
তোমার ও ভাঙাচোরা মনে
হয়তো বা দাগ রয়েগেছে
খুঁজে দেখ।
এখনও কি বৃষ্টিরা এলে
ছুটে গিয়ে উঠোনে তে ভেজ?
এখনও কি চাঁদের কপালে
আমার এ মুখ খানি খোঁজ?
বৃষ্টির জল হয়ে লেগে থাকি
জানালার কাঁচে,
এখনও তো মন পুড়ে
তোমার ঐ সোহাগের আঁচে।
অভিমানে ঝরে গেছি পলাশের ই মত।
খুঁজে দেখ।

‌– পার্থসারথি দত্ত

অন্তহীন – ১ম পর্ব – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta
Story by পার্থসারথি দত্ত

প্রেম হোল ঐশ্বরিক সম্পদ। বাংলা বর্ণমালায় এমন কোন শব্দ নেই যা দিয়ে এর যথাযথ মানে বের করা সম্ভব। তাই তা বর্ণনা করার দুঃসাহস দেখানোর চেষ্টা আমি করিনি। শুধু চেষ্টা করেছি এক অব্যক্ত, অন্তহীন প্রতিক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা নারী মনের প্রেমটাকে আপনাদের চোখের সামনে তুলে ধরার।
রাজা আমার বন্ধু। সহপাঠী নয়। একই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করার সুবাদে। আমি কোলকাতার ছেলে। মেদিনীপুর থেকে ডাক্তারী পাশ করে, পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে এসেছি পোস্টিং নিয়ে। অবশ্যই ইচ্ছে করে।রড় হয়ে ডাক্তার হবো ও গ্রামের মানুষ দের সেবা করব এটাই ছিল স্বপ্ন। বাড়িতে যখন শুনেছিল আমার পোস্টিং পুরুলিয়া, রীতিমতো কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল মা। বাবা যদিও খুব বেশি আপত্তি তোলেন নি। মা’র ধারনা, পুরুলিয়া মানেই মাওবাদীদের মুক্তাঙ্গন। আর আমার যে কোন মুহূর্তে কিছু ঘটে যেতে পারে। তাই বারবার আমাকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, আমি যেদিন প্রথম পুরুলিয়ায় আসি মা’ই ছাড়তে এসেছিল।বাড়ির জিনিস পত্র তখন কিছুই আনিনি।
এর আগে একবার আমি এসেছিলাম পুরুলিয়া C. M. O. H অফিসে জয়েনিং লেটার নিয়ে, সেখান থেকে বাঘমুন্ডির পাথরডি ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পোস্টিং এ পাঠানো হয়েছে। হাওড়া থেকে আমি আর মা ট্রেনে করে বরাভূম স্টেশনে নামি। এবং সেখান থেকে বাই বাস বাঘমুন্ডি। দুপাশে দুর্ভেদ্য জঙ্গল, আর তার মাঝে ছুটে চলেছে আমাদের বাস।শাল, পিয়াল, পলাশ-মহুয়ায় সাজানো বনানী। রাস্তার পাশে অযোধ্যা পাহাড়ের রেঞ্জ আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এতো সুন্দর, এতো সবুজের সমারোহ আমি আগে কখনোই দেখিনি। এখানকার মানুষের ভাষা আদিবাসীদের মতো। আমরা যখন বাঘমুন্ডিতে গিয়ে নামলাম তখন সূর্য অস্ত যাওয়ার পথে। আকাশের বুকে বাদামী রঙের আলো। পাখিদের ঘরে ফেরার ব্যস্ততা, আর তাদের কাকলিতে মুখরিত প্রকৃতি। জন জীবনে এখানে ব্যস্ততা বা ছুটে চলার প্রতিযোগিতা নেই বললেই চলে।
নেমেই একটা রিক্সো ডাকলাম। কোথায় যাবেন বাবু? বলেই রিক্সাওয়ালা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন যেন মায়া লাগলো দেখে। অস্তমিত সূর্যের মতোই তার চোখ যেন ডুবতে বসেছে মুখমণ্ডলের অতল গ্বহরে। আমি যখন বললাম, আমি এই গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছি, বুঝতে পারেন নি। ডাক্তার কথাটা শোনার পর বললেন ও, ঐ হাঁসপাতালটার ডক্টর। আমি বললাম হ্যাঁ। খুব খুশি হয়ে বললেন আরে আসুন আসুন। রিক্সোর শিটের ধূলো হাত দিয়ে ঝেড়ে বসতে বললেন। জিজ্ঞেস করলেন আমরা কোথা থেকে এসেছি। আমি বললাম কোলকাতা। উনি এমন ভাবে তাকালেন যেন অবাক হওয়ার মতো। কইলকাতার ডক্টর হামদের গাঁয়ে? হামদের কি সৌভাগ্য ডক্টর বাবু। কেন? সৌভাগ্য কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম। ডাক্তার জিনিস টা যেন একখানা দেখার জিনিস। উনি সকলকে ডেকে ডেকে বলতে লাগলেন, আমি কোলকাতার ডাক্তার, ওনাদের এখানের হাসপাতালে চিকিৎসা করতে এসেছি ।এই অল্প সময়ের অভিজ্ঞতায় আমার মনে হোল, আতিথেয়তায় অকৃপণ এখানের মানুষ জন। সরলতা এদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মুখের অকৃত্রিম হাসি যেন পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দিতে পারে। এতদিন পর্যন্ত মা’র মনে যে ভয়, যে সংশয় বাসা বেঁধে ছিল সব যেন একটা পলকা হাওয়া এসে উড়িয়ে নিয়ে গেল। শুধু আমার মনে একটা প্রশ্ন গেঁথে গেছে। এতো রুক্ষ মাটিতে এত কোমল, হৃদয়বান মানুষের জন্ম হয় কি করে?

✍️✍️চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…✍️✍️

–পার্থসারথি দত্ত

নারীর অভিলাষ – ভাগ -২

Parthasarathi Dutta
Story by Parthasarathi Dutta

শেষাংশ …(আগের ভাগ )

কনে দেখা আলোয় আলোকিত হয়েছে চরাচর। কিছু ক্ষণ আগে এতো বৃষ্টি হয়েছে কে বলবে। আকাশের বুক থেকে সরে যাচ্ছে মেঘ। সাদা মেঘ এখানে ওখানে পেঁজা পেঁজা তুলোর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রকৃতি আজ আপন মনে, আপন খেয়ালে হাসছে। বিকেলের আকাশে এক রাশ স্নিগ্ধতা। বৃষ্টি স্নাত প্রকৃতির রুপ আজ একটু অন্যরকম। ভিজে যাওয়া পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দ কানে আসছে। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী। রাধার মনের মধ্যেও তাই আজ অদ্ভুত আনন্দ। আজ তার চলার মধ্যে সে নিজেই যেন এক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। মন যেন নিজে থেকে গুন-গুনিয়ে উঠছে। তার খোলা চুলে বাতাসের মত্ততা। আজ খুব শখ করে দুই চোখে কাজল এঁকেছে। ঝাপসা হয়ে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখছে বার বার । আজ সে রতন কে চমকে দেবে। আটপৌরে শাড়ি, কপালে লাল টিপ, পায়ে আলতা আর চোখে কাজল। ব্যস। বর সোহাগী বৌ বলে আজ যেন একটু অহংকার-ই হচ্ছে তার। আজ খুব ইচ্ছে করছে, রতন এসে পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে বলুক, “তুমি সুন্দর তাই চেয়েথাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ।” হ্যাঁ। এটুকুই তো তার চাওয়া আজকের দিনে।রাধার মতো মেয়েরা বিবাহ বার্ষিকী তে দামী উপহার চাই না।কখনো চাই না নামি দামি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে। শুধু চাই তার কাছের মানুষটার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা। নিজের মনে সে যখন কল্পনার জাল বুনতে শুরু করেছে তখনই একজন হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। চিৎকার করে বলে উঠল, “দিদি রতনের এক্সিডেন্ট হয়েছে” । চলন্ত ট্রেন থেকে ছিটকে নীচে পড়ে গেছে রতন। আর তার পায়ের উপর দিয়ে পেরিয়ে গেছে লৌহ-দানব। তাকে ভর্তি করা হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে বড় কোন শহরে নিয়ে যাবে। এখানে তো এতবড় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া পুরো কথা গুলো রাধা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু তার আঘাত তাকে স্তব্ধ করে দিল। হায় রে মানুষের ভাগ্য! যখন তুমি নিজের খেয়ালে কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াচ্ছ, ভগবান তখন তার অন্তরীক্ষে থেকে হাসছে। এত সুখ এত আনন্দ এসব যে কোন গরিবদের থাকতে নেই, রাধা কি তা জানতো না? রাধা এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় । জানেনা কোথায় যাবে, কি করবে। ঠিক ভাবতে পারছে না, এখন তার কি করা উচিত।
ডাক্তার জানিয়েছেন রতনের জ্ঞান ফিরেছে। তবে তার একটা খুব বড় অপারেশন করতে হবে। দরকারে তার একটা পা হাঁটুর নীচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। কিন্তু এতো টাকা সে এখন পাবে কোথায়? কার কাছে ধার চাইবে? দুবেলা দুমুঠো ভাত কোন রকমে জোটে যে সংসারে সেখানে এতগুলো টাকা? গ্রামে যে মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু আছে, সেটাও সামান্য।তা বিক্রি করেই আর কতটুকু টাকা পাওয়া যাবে। ভাবতে ভাবতে সে পাগলীনির মত। সারা রাত রাস্তায় রাস্তায় এর ওর কাছে সাহায্য চেয়েছে। ক্লান্ত হয়ে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারে না। যখন ঘুম ভাঙে তখন সকালের আলো তার চোখে এসে লেগেছে। দেখে সে এক বাড়ির বারান্দায় শুয়ে আছে ।খিদে আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠেছে সে। রাস্তায় বেরিয়ে আসে রাধা। দেখতে পায় এত মানুষের কোলাহল, ছুটে চলা। গতিময় জীবন । গ্রাম্য জীবন থেকে অনেক আলাদা। সর্বগ্রাসী সুনামির ঢেউয়ের মত এখানে জীবন ছুটে চলেছে। আর দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটছে রাধা। এর ওর কাছে প্রার্থনা করছে যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়।
আজ দু তিন দিন এভাবেই কেটে গেল। কিন্তু খুব বেশি কিছুই ব্যবস্থা করা গেল না। এর ওর কাছে ভিক্ষে করে যা টুকু পাওয়া তা নিতান্তই সামান্য। আজ তিন দিন সে ভালো করে খায় নি, ঘুমোয় নি। দেখলে পাগলী বলেই মনে হয়। গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে আর কিছু সাহায্যের পয়সা দিয়ে আজ রতনের অপারেশন এর জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু ভগবানের মুখ পানে চেয়ে থাকা। নিস্তেজ শরীর। ক্লান্ত অবসন্ন। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা টুকু ও নেই। এতক্ষণ যেন কোন মায়া বলে ছুটে চলেছিল সে। ওটির লাল রঙের বাতিটার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠলো। হাজার বছরের ঘুম নামল তার চোখে। মাটিতেই ঘুমে লুটিয়ে পড়ল তার অবচেতন দেহ।
হাতের উপর কেউ পা দিয়ে পেরিয়ে গেল। তারই ব্যথায় উঠে পড়ল সে।হাতের ব্যথার দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ধড়ফড় করে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে গেল তার।পেটে খিদের সমুদ্র তোলপাড় করে উঠলেও, চোখের সামনে অন্ধকার। পয়সা নেই।নেই শরীরের শক্তি টুকু ও। ক্ষুধার্ত পেট কি আর সে কথা বোঝে? অথচ মনের মধ্যে তখনও তার স্বামীর চিন্তা। নার্স এসে বলল, রতনের বাড়ির কেউ আছেন? হ্যাঁ। বলে মুখ তুলে তাকালো রাধা। মুখে তার প্রগাঢ় চিন্তার স্পষ্ট ছায়া। চোখে একরাশ কৌতুহল। ওনার অপারেশন হয়ে গেছে। ওনাকে বেডে দেওয়া হয়েছে। আপনি ভেতরে আসুন। কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে ভেতরে গেল রাধা। আজ অনেক দিন পর রতন কে সে দেখল। চোখ দুটো জ্বালা করছে তার। বুকের ভেতর টা ঠুকরে কেঁদে উঠল। এই কদিনেই শরীর ভেঙে গেছে তার। ডান পা টাও কেটে বাদ দিতে হয়েছে। ডাক্তার বলে গেছেন তাকে যেন কোন মতেই উত্ত্যক্ত না করা হয়। তাই নিঃশব্দে চোখের জল মুছে রতনের পাশে এসে বসল রাধা। তার হাতের আঙ্গুল গুলো রতনের মাথার উস্কো খুস্কো চুল গুলোর ভেতর চালনা করল। রাধা জানে ভবিষ্যতে তাদের জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। বসত ভিটে টুকু ও বিক্রি করতে হয়েছে। অন্নসংস্থানের ও কোন ব্যবস্থা নেই। পথে নামা ছাড়া আর যে কোন উপায় নেই। কিন্তু এই মানুষটিকে নিয়ে কি ভাবে কাটাবে? এখান থেকে ছুটি হলে, কোথায় গিয়ে রাখবে তাকে? এসব ভাবতে ভাবতে সে রতন এর কাছ থেকে সরে গিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগলো। হাসপাতালের ঝুল জমে থাকা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠলো, হে ঈশ্বর!
আজ রতনের ছুটি হয়ে গেছে।দীর্ঘ দু মাস রোগ ভোগের পর আজ হসপিটালের চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে দুজনেই। শরীরের শক্তি প্রায় নিঃশেষ। এই দু মাস রাধা ভিক্ষে করে যা পেয়েছে তাই দুজনে মিলে খেয়েছে। যেদিন সেরকম কোন কিছুই জোটে নি সেদিন স্বামীকে খাইয়ে নিজে অভুক্ত থেকেছে। কিন্তু তার স্বামীকে জানতে পর্যন্ত দেয় নি। কোন দিন আধপেটা খেয়ে কোন দিন শুধু মাত্র জল খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে সারাদিন। এই দু মাসের অভিজ্ঞতা তার জীবনে এনেছে বার্ধক্যের ছায়া। কপালে এঁকেছে বলিরেখার চিহ্ন। হসপিটাল ছেড়ে তারা বড় রাস্তা ধরল। দশ টা এগারোটার রোদ যেন আগুন হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। জনবহুল রাস্তা যেন খাঁ খাঁ করছে। রতন খুব তৃষ্ণার্ত বোধ করছিল। একটা বাড়ির বারান্দায় রতন কে বসিয়ে রাধা ছুটল জল আনতে। এতো কিছুর পরেও স্বামীর প্রতি রাধার ভালোবাসা একটু ও কমেনি। জল ভর্তি করার পর রাস্তা পার হতে হবে, এমন সময় হঠাৎ তার মাথাটা বনবন করে ঘুরে গেল। মূহুর্তে ঝাপসা হয়ে উঠল চারপাশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটা গাড়ি ধাক্কা মারল। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রাধা। সমস্ত শরীর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। তার অন্তরাত্মা চিৎকার করে উঠলো, “ভগবান তুমি আমার মৃত্যু দিও না। আমি মরেও শান্তি পাব না। আমি কার কাছে আমার স্বামীকে রেখে নিজের মৃত্যু কামনা করব? এই জটিল পৃথিবীতে আমার রোগগ্রস্ত পঙ্গু স্বামীর আমি ছাড়া যে আর কেউই নেই। যদি একান্তই আমার প্রাণের প্রয়োজন হয় তাহলে আমার আগে আমার স্বামীর জীবন নেন প্রভু। যাতে মৃত্যুর পর আমি একটু শান্তি পেতে পারি।”রতন রাধা রাধা করে চিৎকার করে উঠলো। ততক্ষণে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। রতন ও কোন রকমে তার কাছে এগিয়ে এসেছে।রাধার রক্তে ভেজা মাথা খানি তার কোলের উপর নিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদছে। পাশের একজন বলে উঠল, ইস্!! কি মর্মান্তিক মৃত্যু!! রতন চিৎকার করে বলতে লাগল মৃত্যু নয়, মৃত্যু নয়। হতভাগী মুক্তি পেয়েছে। মুক্তি।
“কাল কেউটের ফনায় নাচছে লখিন্দর এর স্মৃতি,
বেহুলা কখনো বিধবা হয় না এটা বাংলার রীতি। ভেসে যায় ভেলা এবেলা ওবেলা একই শব দেহ নিয়ে।
আগেও মরেছি আবার মরব প্রেমের দিব্যি দিয়ে। জন্মেছি আমি আগেও অনেক মরেছি তোমারই কোলে
মুক্তি পাইনি শুধু তোমাকেই আবার দেখব বলে।”

–পার্থসারথি দত্ত