প্রেমের নৌকাডুবি – মধ্যাংশ – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta

#মধ্যাংশ#

অপু মেয়ে টা কে এখনও ঠিক ঠাক বুঝে উঠতে পারেনি মৃণাল। খবর টা পেয়ে অপুই ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছে। পার্কে বসে একগুচ্ছ ফুল দিয়ে সে বলেছিলো , যাও যুদ্ধে জয়ী হয়ে এসো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। অপেক্ষা করব দেশের সেবাই উৎসর্গ করা সেই মানুষ টির জন্য। দেশ বাঁচাতে সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রহরীর জন্য। যার শরীরের পারফিউমের গন্ধ নয়, ঘামের গন্ধটা আমার খুব প্রিয় লাগবে। যার শরীর এর উর্দিটা আমার মত অনেক নারীর অলংকার হয়ে থাকবে। মনে মনে অপুর জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল। হায় রে ভারতীয় নারী, তোমাদের এই আত্মত্যাগ মানুষ ভুলে যায় কেমন করে? নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষটা কে এতদূরে রেখে যে নারীরা দুশ্চিন্তায় প্রহর গোনে, তার হিসেব আমরা আর কতটুকুই বা রাখতে পারি।
তিন মাসের ট্রেনিং তার শেষ হয়েছে। আজ তাই আনন্দে আত্মহারা সে। বুকের ভেতর বাজছে তার ঘরে ফেরার গান। অপুর সেই হাসি মাখা মুখ খানি দেখার জন্য সে ব্যকুল। আজ তার মুখ খানি বারবার ভেসে উঠছে মনের মধ্যে। এক সাথে পার করা সুন্দর মুহূর্ত গুলো বারবার তার চোখে ভিড় করে আসছে। মনে পড়ছে গ্রামের মানুষ গুলোর কথা, মাটির গন্ধটা।কানে বাজছে সন্ধ্যায় মন্দিরের আরতির ঘন্টার শব্দ। সন্ধ্যা প্রদীপ, শাঁখের আওয়াজ। আর তাই ফেলে আসা দিন গুলো কে এক সুতোই গাঁথতে চেষ্টা করছে সে। ট্রেনিং এর এই তিন মাস তাদের কাছে ফোন ও রাখতে দেওয়া হয় না। সপ্তাহে শুধু মাত্র একটা দিন বাড়ির সাথে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় অফিসের ফোন থেকে। কিন্তু সেখানেও এতো ভিড় যে বাড়ির সাথেই ঠিক ঠাক কথা হয় না।আজ তিন মাস কোন যোগাযোগ নেই অপুর সঙ্গে। জানেনা কেমন আছে সে। এতদিনের প্রতিক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে।সময় যত পার হচ্ছে ততই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। আর তো মাত্র একটা স্টেশন, তার পরেই তাকে নামতে হবে। ট্রেনের সিটে বসে থাকতে পারছে না। বারবার উঠে গেটের সামনে চলে আসছে। তাকিয়ে দেখছে বাইরের জগৎ টার দিকে। কি মোহময় শান্তি গ্রামের বাতাসে। এক বুক নিঃশ্বাস টেনে মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা অনেক হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে কাটা দগদগে ঘা এর ওপর শান্তির প্রলেপ লাগলো। স্টেশনে নেমে খুঁজতে থাকে চেনা মুখ গুলো। বিপিন, অজিত, নিখিল সবাই এসেছে। আবেগ টা আজ চোখ চীরে বেরিয়ে আসছে।
খুব কাছাকাছি তারা দুজন। কিন্তু নিস্তব্ধ। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। খুঁজে পাচ্ছে না কোথা থেকে শুরু করবে। সন্ধ্যার আকাশে চৈতালি চাঁদ। কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে আলো এসে পড়ছে অপুর মুখে। অনেক দিন আগে কোন এক পড়ন্ত বিকেলে এই গাছের ওপরে নিজেদের নাম লিখে রেখেছিল দুজনে। আজ সেই গাছের গায়ে হাত দিয়ে সেটাই খুঁজছে। এত কথা বলার ছিল, কোথায় হারালো সব? আজ অপুর মুখে হাসি নেই। এ মুখ তার অচেনা। এত গম্ভীর মুখে কোন দিন সে অপুকে দেখেনি। আজ কেন বাতাস বইছে না? হঠাৎ অপু তাকে জড়িয়ে ধরল। বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে কি যেন খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। এতক্ষণ ধরে ভারি হয়ে থাকা বুকের ভেতর টা একটু হাল্কা লাগছে। গুমোট পরিবেশ যেন বাতাসের হাওয়াই ফুরফুরে মেজাজে ফিরে এলো। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোন ভাষা লাগে না। ভালোবাসার মানুষ টার চোখের দিকে তাকিয়ে মেপে নেওয়া যায় তার গভীরতা। তার মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ে ফেলা যায় প্রেমের পদ্য গুলো। অপুর মুখ খানি মৃনালের হাতে। আবেগে বুজে গেছে চোখ। তিরতির করে কেঁপে উঠছে তার ঠোঁট। আকাশের চাঁদ টাও লজ্জিত হয়ে ঢেকে গেল সাদাকালো মেঘের ভেতরে।
এভাবেই কেটে গেল অনেক গুলো দিন। এবার তাকে ডিউটিতে ফিরে যেতে হবে। তার প্রথম পোস্টিংই কাশ্মীরে। ভারতের এই শীতল বরফের জায়গাটা বহিরাগত শত্রুর সঙ্গে লড়াই এ জেরবার।
উরি কিংবা পাঠানকোটের মতো ঘটনা যে কোন সময় ঘটে যাওয়া আকস্মিক কিছু নয়। সন্ধ্যা বেলা স্টেশনে সব বন্ধুরাই ছাড়তে এসেছিল মৃণাল কে।গ্রাম থেকে দিল্লি ও দিল্লি থেকে শ্রীনগর হয়ে পৌঁছানো হল কাশ্মীর এর আর্মি ক্যাম্প এর ভেতর।
কাশ্মীর না বলে এটাকে স্বর্গ বললেই মনে হয় ভালো হয় । আর তাই এই স্বর্গরাজ্য দখলের জন্য বারবার চেষ্টা করে অসুরের দল। আর সেই অসুরদের নিধন করতে যুগে যুগে অবতীর্ণ হন ভগবান। হ্যাঁ। ভগবান ই তো। সেই ভগবান আর শত্রুর লড়াই হয় এই যুদ্ধ ভূমিতে। ভারতের বীর সেনাবাহিনীর রক্তে ভিজে যায় পুণ্য ভূমি। তবু তাঁরা অঙ্গীকার বদ্ধ দেশ বাঁচাতে। তাঁদের শক্ত চোয়াল, গ্রন্থীল পেশী আর নির্ভীক বুকের ভেতরে বাজতে থাকে,”বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী। ”

মাটির থেকে সাতশো আটশো ফুট ওপরে।এখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাইনাস দশ কি বার। সাদা বরফের চাদরে ঢাকা কাশ্মীরের পাহাড়। গাছের ডাল, পাতা সমস্তই বরফে ঢাকা। প্রকৃতির অকৃপনতায় সৌন্দর্যের পশরা সাজিয়ে বসে আছে কাশ্মীর।
‌ কাজের চাপ এখানে ভালোই। হাতে মোবাইল ফোন থাকলেও নেটওয়ার্ক ঠিক ঠাক পাওয়া যায় না। তাছাড়া কখন কোথায় ডিউটি করতে হবে কেউ যানে না। এরই মাঝে কখনো কখনো খবরাখবর নেয়। অপুর সাথে অনেক দিন কথা হয় নি। কি হয়েছে তার কে জানে। বিপিন, অজিতের কাছে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তারা কেউই তার খবর দিতে পারে নি। নিখিল শুধু একবার বলেছিল আজকাল খুব একটা বাইরে বেরোয় না। কলেজেও আসে না। কারও সাথেই আর যোগাযোগ করে না। মৃণাল এবার পূজোর ছুটি পায় নি। প্রথম পোস্টিং তাই ছয় মাসের আগে ছুটি পাওয়া খুব কঠিন। আগে থেকেই তাই নভেম্বর মাসে ছুটির দরখাস্ত করে রেখেছে। শীত কালটা অবশ্য ঘরে কাটানো যাবে। মাঝে মাঝে অপুর জন্য খুব চিন্তা হয় তার। খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অনেক ভাবেই খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু কোন চেষ্টাই তার সফল হয় নি।
ছুটি তার মঞ্জুর হয়েছে। তাই আজ আবার ঘরে ফেরা। কিন্তু কেন জানি না আজ একটা অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। কোথায় যেন একটা ভয়। হ্যাঁ ভয় ই। প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয়। আজ তার মন বড় চঞ্চল হয়ে উঠেছে। জানি না কি অপেক্ষা করছে তার জন্য। জানেনা কেমন আছে তার অপু। আজ বারবার তার ফোন ট্রায় করে যাচ্ছে। কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। বিপিন কি কিছু লুকিয়ে যাচ্ছে। সে শুধু ফোন তুলে বলল, ও তুই আজ আসছিস? আয়। কোথায় যেন সুর কেটে যাচ্ছে। কেমন উদাস হয়ে গেছে মৃণাল। সময় যেন কাটতে চাইছে না। কি হয়েছে তাদের? সব ঠিক আছে তো?
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে বাড়ি পৌঁছানো। আজ এতো সকালে কেউ ই আসেনি স্টেশন এ। মস্ত একটা কাঠের বাক্স একা নামাতে হলো ট্রেন থেকে। তার পর এক টোটো ডেকে তার মধ্যে বসিয়ে বাড়ি ফিরছে। কি আছে দাদা এই বাক্সে? তোমার রাইফেল? বন্দুক? না রে বোকা এতে আপেল আছে। কাশ্মীরের আপেলের নাম শুনিস নি? ও এবার বুঝলাম। আচ্ছা যাদু বাড়িতে সবাই কেমন আছে রে? ভালো। কেন দাদা? না এমনই জিজ্ঞেস করলাম। গ্রামের সবাই কেমন আছে? বিপিন, অজিত, নিখিল সবাই ভালো আছে তো? হ্যাঁ দাদা, সবাই খুব ভালো আছে। ও আচ্ছা। আচ্ছা শোন তুই বাজারের ভিড় এ না ঢুকে বামুন পাড়ার রাস্তা দিয়ে চল। ঠিক আছে দাদা। ইচ্ছে করেই বামুন পাড়ার রাস্তা দিয়ে ঢুকল মৃণাল। যদি অপুর সঙ্গে দেখা হয়। যদি সে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে তার আশায়। তার আসার খবর নিশ্চয়ই পেয়েছে, বিপিন-অজিত এর কাছে। দূর থেকে হঠাৎ চোখে পড়ল অপুদের বাড়িতে বিয়ের প্যান্ডল। বাইরের চোখ ধাঁধানো শৌখিন গেট। কার বিয়ে রে? ও আমাদের অপুদিদির গো। তুমি জানতে না। ছেলে টা খুব বড় ডাক্তার।বিদেশে থাকে। আর কোন কথা কানে ঢুকছে না। মাথার উপর ভেঙে পড়ল আকাশ। এক লহমায় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল সব স্বপ্ন, সব আশা। বাড়ির বাইরে বরের গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা। অনেক ভিড় তাই টোটো টা দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু দাঁড়াতে হবে দাদা। মনে হচ্ছে কনে বিদায় হচ্ছে। ঝাপসা চোখে চোখাচোখি হলো দুজনের। অব্যক্ত যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠছে তার হৃৎপিণ্ড। চোখ দিয়ে ঠিকরে বেরোচ্ছে জলন্ত আগ্নেয় গিরির লাভা
।বুঝতে পারছেনা সে কি করবে, অপু যে এই ভাবে তার বিশ্বাস নিয়ে খেলবে এটা ভাবতেই তার গা শিউরে উঠছে ।একজন যখন খেলাঘর গড়ার স্বপ্নে বিভোর অন্য জন তখন খেলাঘর ভাঙ্গার যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে তার মুখ। সিঁথিতে সিঁদুর আর লাল বেনারসি শাড়ি তে কি সুন্দর মানিয়েছে তাকে।
কিন্তু সব সৌন্দর্য তো সবার জন্য নয়।সৌন্দর্য চোখ দিয়ে দেখা যায়। কিন্তু উপভোগ করার জন্য লাগে অন্তরাত্মা। সেই অন্তরাত্মার হৃদয়াকাশে আজ কালো মেঘের ঘনঘটা। ভেতর থেকে গুরু গুরু শব্দ আর বিদ্যুতের শানিত ফলায় শতছিন্ন তার মন।

‌চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত

প্রেমের নৌকাডুবি – প্রথমখন্ড – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta

#প্রথমখন্ড#

সবে ল্যাপটপ খুলেছি “নৌকাডুবি” দেখব বলে। নেট থেকে কোনরকমে ডাউনলোড করলাম। ডাউনলোড স্পিড এতো কম মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যায়। মোবাইল থেকে দেখব বলে কত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। রাত্রি বেলা তো আরও স্লো হয়ে যায়। বিরক্তিকর।
আর্ট ফিল্মে রাইমার অভিনয় টা আমার প্রথম থেকেই ভালো লাগে। প্রথমেই রাইমার লিপে “খেলাঘর বাঁধতে নেমেছি।” গানটা শুনতে শুনতে “আমার মনের ভিতরে” সবে ডুবতে শুরু করেছে “নৌকাডুবি “। ঠিক সেই সময় বেজে উঠল চেনা রিংটোন। ” চেনা মুখ, ছুঁয়ে থাকা দৃষ্টি। এলোমেলো আড্ডা, চায়ের গেলাস্। ঘুম ঘুম ক্লাস রুম, পাশে খোলা জানালা। ডাকছে আমাকে তোমার আকাশ। ” এই সময় আবার কে? এতো রাত্রে? মোবাইল টা আজ একটু দূরেই রেখেছি। না হলে ফেসবুক এর নেশাটা আমাকে আবার সিনেমাটা শেষ করতেই দেবে না। অপু এত রাতে? তাড়াতাড়ি ফোন টাকে রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠল হ্যালো? মৃণাল? হ্যাঁ ।বলছি বলো। শোন না বলছিলাম কি ফেসবুকে গানের লড়াই টা বেশ জমে উঠেছে। শিগগির এসো। খুব মজা হচ্ছে। না অপু। শোন। আমি কিছু শুনতে চাই না। তুমি এসো তাড়াতাড়ি। বলেই হুট করে ফোনটা কেটে দিল। আচ্ছা জ্বালাতন করে তো মেয়ে টা। একে আবার বেশি কিছু বলাও যায় না। মুখ ফুলিয়ে, রাগ দেখিয়ে, যাচ্ছে তাই কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। বড় লোক বাপের অভিমানি মেয়ে। আমাকে কি বাড়ির কাজের লোক পেয়েছে নাকি? যখন যা বলবে শুনতে হবে। সেদিন ওরকম হঠাৎ বিকেল চারটেতে ফোন করে বলে কফি সপে আসতে হবে। আব্দার আর কি? কত করে বললাম শোন অপু আমার পাঁচ টা থেকে টিউশন ক্লাস আছে। সব ছেলে মেয়েরা এসেপড়বে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। দুম করে বলে ফেলল অত শত বুঝি না। আমি অপেক্ষা করছি। তোমাকে আসতে হবে। একদিন তো রাত দুটো তে ফোন করে বাইনা শুরু করে তাকে এত রাত্রে ফোক কিংবা ভাটিয়ালি শোনাতে হবে। মামা বাড়ির আব্দার? ল্যাপিতে তখন “বাহিরের খেলায় ডাকে সে, যাব কি করে” সুরটা ভেসে উঠল। থাক আজ না হয় “নৌকাডুবি”তেই মনঃসংযোগ দিই। অপু কে না হয় পরে মানিয়ে নেওয়া যাবে।
‌ অপুর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ কলেজের নবীন বরন উৎসবে। সেদিন সন্ধ্যায় পটাদা এসেছিলেন আমাদের কলেজে। অনেক গুলো গানের সাথে আমার ভালোলাগার ” তোমায় দিলাম আজ ” গানটা ও গাইলেন। এর পর আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন আমরা কেউ যদি ওনার সাথে গান ধরি। অগত্যা বন্ধুরা সবাই মিলে আমাকে বলির পাঁঠা করল। স্টেজে উঠে আমি আর পটাদা শুরু করলাম “কলঙ্কিনী রাধা “। গান শেষে পটাদার সাথে হাত মেলাতে গিয়ে তাঁর হাতে চিমটি কেটে দিলাম। স্টেজ থেকে নামতে গিয়ে দেখি একটি মেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার সাথে পরিচয় করতে এগিয়ে এসেছে। গানটা নাকি ওর খুব পছন্দের। আর আমি নাকি খুব সুন্দর ভাবে গেয়েছি। ধন্যবাদ বিনিময়ে কথোপকথন শেষ করব হঠাৎ মেয়ে টা বলে বসল একটা অনুরোধ আছে যদি রাখেন? হ্যাঁ অবশ্যই। বলুন কি করতে হবে। না। সেরকম কিছু না। আসলে পটাদার একটা সিগনেচার চাই। এই ডাইরির মধ্যে। হ্যাঁ দিন। বলে ডাইরি আর কলম টা নিলাম ওর হাত থেকে। তারপর কলেজ এ প্রায় মাঝে মধ্যে দেখা হয়। একদিন ক্যান্টিনে বসে টেবিল বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করেছি হঠাৎ মেয়েটি ঢুকল। একটা মিষ্টি হাসি তার মুখে ঝলমল করে উঠলো। আমি হাঁদা বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে বেরিয়েও গেল। সেদিন কলেজ ছুটির পর বাসের অপেক্ষা করছি, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে । দেখি সে বৃষ্টি তে ভিজে ছুটে আসছে। তাকে দেখে আমার আবার হার্টবিট বেড়ে যায়। কাছে দাঁড়িয়ে অভিযোগের সুরে বলল আপনি মোটেও ভালো লোক নন। আমি তো হতচকিত হয়ে পড়লাম। কিন্তু কেন? মেয়েদের দেখে একটা সাইলেন্ট স্মাইল দিতে হয় সেটুকুও জানেন না। যাক বাবা ধড়ে প্রান এলো। আমি মাথা চুলকে বললাম হবে হয়তো। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে আমি সত্যিই খুব ভয় পেতাম। ঠিক ভয় না। আড়ষ্টতা বলতে পারেন। অপুর জন্যই অনেক টা সাবলীল হয়েছি। কথোপকথনের মাঝে নিজেদের পরিচয় হলো। আমি অপু মানে অপরাজিতা চ্যাটার্জি। ও। আমি…..। থাক আর বলতে হবে না। আপনি মৃণাল সেনগুপ্ত। হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে? জানতে হয় মশাই। আপনি বাংলা অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আমি ফার্স্ট ইয়ার। বাংলা অনার্স। ও আপনিও বাংলা অনার্স? হ্যাঁ। যাক তাহলে সাহিত্য রসের অভাব হবে না? হ্যাঁ। পুরো রসগোল্লা। ও, বুঝলাম। তা কোলকাতার রসগোল্লার নাম আগে শুনেছি…… আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে উঠল কোলকাতার রসগোল্লা নই মশাই ভোলা ময়রার রসগোল্লা। দুজনে একসাথে হেসে উঠলাম।
‌ সেদিন প্রথম কলেজ কাট করে দুজনে মিলে সিনেমা দেখতে গেছি। ওই দুটো টিকিট কেটে এনেছিল। এই প্রথম দুজনে খুব পাশাপাশি। আজ প্রথম হাতধরে হাঁটা। সিনেমা দেখতে দেখতে হাতে হাত রাখা। ভালোবাসার প্রথম স্পর্শ। আমি চোরা বালিতে তলিয়ে যাচ্ছি। খুব ভয় করছে আমার, ঠিক ঠাক তল খুঁজে পাব তো? আমি ওর হাতটা খুব আলতো করে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কি হচ্ছে? ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখে চোখ রেখে অনেক না বলা কথা বলে দেওয়ার চেষ্টা করল ।সেদিন রাত্রে আমি ঘুমোতে পারিনি।জীবনে কখনো দু নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না। আমার লক্ষ্য, আমার ভবিষ্যৎ আলাদা। আমি টিউশন পড়িয়ে কয়েকটা টাকা রোজগার করে সংসার চালাই সাথে নিজের পড়াশোনা। আর ও বড়লোক বাড়ির মেয়ে। এসব কথা ও কোন মতেই শুনতে চাই না। বুঝতে চাই না আমরা দুজন ভিন্ন মেরুর। অভাবের সংসারে ভালোবাসার জায়গা হয় না। তার বাবা হয়তো মনে মনে কোন রাজপুত্রের সন্ধান করছেন। ভিখিরি হয়ে সে রাজপ্রাসাদে ঢোকার দুঃসাহস দেখানোর ইচ্ছে আমার নেই।
‌ সেদিন অনেকক্ষণ পার্কে বসে ছিল দুজনে।অপুই জোর করে ফোন করে ডেকে এনেছে মৃনাল কে। ইদানিং মৃনাল খুব এড়িয়ে চলছে। আগের মত সে আর নেই। কি যেন হয়েছে তার। হঠাৎ কেমন করে সে যেন পাল্টে গেছে। অপু তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে তোমার? কৈ কিছু না তো। না বললেই হলো। আমাকে বলো প্লিজ। কি যেন একটা অপরাধ বোধ কাজ করছে তার । আজ অপুর চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই। শেষ পর্যন্ত মনে জোর এনে বলেই ফেলল। শোন অপু মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে বা দেখাতে আমি পছন্দ করি না। আমার বর্তমান বা ভবিষ্যৎ তুমি খুব ভালো করেই জানো। শুধু তাই নয়, আমি কিন্তু কখনো তোমার যোগ্যও নই। আমার ইচ্ছে গান বাজনা বা গ্রাজুয়েট হওয়া নয়। আমি চাই ডিফেন্স লাইনে যুক্ত হতে। দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছে আমার ছোট থেকে। আমার জীবনের সাথে নিজের জীবন টাকে জড়িয়ে অভিশপ্ত করে ফেলোনা। তাতে কি? আমি কি তোমাকে বারন করেছি? তোমার স্বপ্ন, সে তো আমার ই স্বপ্ন। আহ্। কি যা তা বলছ? হ্যাঁ ঠিক ই বলছি।
‌ ছোট থেকেই মৃনালের ইচ্ছে ছিল ডিফেন্স এ যুক্ত হওয়া। দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছে তাকে খুব নাড়া দেয়। আর তাই কলেজ আর টিউশন এর ফাঁকে সে ফর্ম ভরতো ডিফেন্স এর। সকাল সন্ধ্যা দুবেলা নিয়মিত মাঠে যেত। নিয়মিত শরীর চর্চা করতো। কয়েক বার লাইনে গিয়ে ঘুরেও এসেছে। কখনো সময়ে মাঠ কমপ্লিট করতে পারে নি। তো কখনো বুকের ছাতির জন্য বাদ পড়তে হয়েছে। কিন্তু সেদিকে ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। চেষ্টার কসুর করে না। আর্মি হওয়ার নেশাটা তাকে পেয়ে বসেছে। খুব শীঘ্রই একটা লাইন আছে। এবার তাকে কোয়ালিফাইড করতেই হবে।
‌ না। এবার তার পরিশ্রমটা বিফলে যায়নি। এবার খুব ভালোভাবেই নিজের যায়গাটা পাকাপাকি করে নিয়েছে। আজ জয়েনিং লেটার হাতে পাওয়ার পর তার খুব আনন্দ হচ্ছে। যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। দেশের সেবাই নিজেকে উৎসর্গ করার আনন্দ। আজ খুব ইচ্ছে করছে পুরো গ্রাম, মাঠ ঘাট, বনের মধ্যে সেই খুশিটাকে ছড়িয়ে দিতে। তার টিউশন এর ছেলে মেয়ে দের মিষ্টি খাইয়েছে। আজ তার চোখ ভিজে আসছে বারবার। এই ছোট ছোট মুখ গুলো বারবার ভেসে উঠছে তার চোখে।আর তো তাদের প্রতি দিন দেখতে পাবে না। তাদের চিৎকার, চেঁচামেচি, হৈ হুল্লোড়। কোন কিছুই আর ফিরে আসবে না। মনে পড়ছে তাদের নিয়ে পার করে আসা অনেক সুখ স্মৃতি। মনে পড়ছে বিকেলের ফুটবল। চায়ের দোকানের আড্ডা। আর সেই গ্রামের মানুষ গুলোর কথা। যাদের সময় অসময় পাশে দাঁড়িয়েছে। যাদের কোন কিছু হলে রাত্রেও ছুটে বেরিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ভরসা যুগিয়েছে। নিজের যৎসামান্য উপার্জনের কিছু তাদের জন্য বিলিয়ে দিয়েছে। যে গ্রাম ছেড়ে সে একটা দিন ও বাইরে কাটায় নি, সেই গ্রাম ছেড়ে তিন মাস? পুনেতে তার ট্রেনিং। এই তিন মাস তাই সব কিছুই তাকে ভুলে যেতে হবে।
‌চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত

নারীর অভিলাষ – ভাগ -২

Parthasarathi Dutta
Story by Parthasarathi Dutta

শেষাংশ …(আগের ভাগ )

কনে দেখা আলোয় আলোকিত হয়েছে চরাচর। কিছু ক্ষণ আগে এতো বৃষ্টি হয়েছে কে বলবে। আকাশের বুক থেকে সরে যাচ্ছে মেঘ। সাদা মেঘ এখানে ওখানে পেঁজা পেঁজা তুলোর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রকৃতি আজ আপন মনে, আপন খেয়ালে হাসছে। বিকেলের আকাশে এক রাশ স্নিগ্ধতা। বৃষ্টি স্নাত প্রকৃতির রুপ আজ একটু অন্যরকম। ভিজে যাওয়া পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দ কানে আসছে। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী। রাধার মনের মধ্যেও তাই আজ অদ্ভুত আনন্দ। আজ তার চলার মধ্যে সে নিজেই যেন এক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। মন যেন নিজে থেকে গুন-গুনিয়ে উঠছে। তার খোলা চুলে বাতাসের মত্ততা। আজ খুব শখ করে দুই চোখে কাজল এঁকেছে। ঝাপসা হয়ে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখছে বার বার । আজ সে রতন কে চমকে দেবে। আটপৌরে শাড়ি, কপালে লাল টিপ, পায়ে আলতা আর চোখে কাজল। ব্যস। বর সোহাগী বৌ বলে আজ যেন একটু অহংকার-ই হচ্ছে তার। আজ খুব ইচ্ছে করছে, রতন এসে পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে বলুক, “তুমি সুন্দর তাই চেয়েথাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ।” হ্যাঁ। এটুকুই তো তার চাওয়া আজকের দিনে।রাধার মতো মেয়েরা বিবাহ বার্ষিকী তে দামী উপহার চাই না।কখনো চাই না নামি দামি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে। শুধু চাই তার কাছের মানুষটার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা। নিজের মনে সে যখন কল্পনার জাল বুনতে শুরু করেছে তখনই একজন হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। চিৎকার করে বলে উঠল, “দিদি রতনের এক্সিডেন্ট হয়েছে” । চলন্ত ট্রেন থেকে ছিটকে নীচে পড়ে গেছে রতন। আর তার পায়ের উপর দিয়ে পেরিয়ে গেছে লৌহ-দানব। তাকে ভর্তি করা হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে বড় কোন শহরে নিয়ে যাবে। এখানে তো এতবড় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া পুরো কথা গুলো রাধা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু তার আঘাত তাকে স্তব্ধ করে দিল। হায় রে মানুষের ভাগ্য! যখন তুমি নিজের খেয়ালে কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াচ্ছ, ভগবান তখন তার অন্তরীক্ষে থেকে হাসছে। এত সুখ এত আনন্দ এসব যে কোন গরিবদের থাকতে নেই, রাধা কি তা জানতো না? রাধা এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় । জানেনা কোথায় যাবে, কি করবে। ঠিক ভাবতে পারছে না, এখন তার কি করা উচিত।
ডাক্তার জানিয়েছেন রতনের জ্ঞান ফিরেছে। তবে তার একটা খুব বড় অপারেশন করতে হবে। দরকারে তার একটা পা হাঁটুর নীচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। কিন্তু এতো টাকা সে এখন পাবে কোথায়? কার কাছে ধার চাইবে? দুবেলা দুমুঠো ভাত কোন রকমে জোটে যে সংসারে সেখানে এতগুলো টাকা? গ্রামে যে মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু আছে, সেটাও সামান্য।তা বিক্রি করেই আর কতটুকু টাকা পাওয়া যাবে। ভাবতে ভাবতে সে পাগলীনির মত। সারা রাত রাস্তায় রাস্তায় এর ওর কাছে সাহায্য চেয়েছে। ক্লান্ত হয়ে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারে না। যখন ঘুম ভাঙে তখন সকালের আলো তার চোখে এসে লেগেছে। দেখে সে এক বাড়ির বারান্দায় শুয়ে আছে ।খিদে আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠেছে সে। রাস্তায় বেরিয়ে আসে রাধা। দেখতে পায় এত মানুষের কোলাহল, ছুটে চলা। গতিময় জীবন । গ্রাম্য জীবন থেকে অনেক আলাদা। সর্বগ্রাসী সুনামির ঢেউয়ের মত এখানে জীবন ছুটে চলেছে। আর দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটছে রাধা। এর ওর কাছে প্রার্থনা করছে যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়।
আজ দু তিন দিন এভাবেই কেটে গেল। কিন্তু খুব বেশি কিছুই ব্যবস্থা করা গেল না। এর ওর কাছে ভিক্ষে করে যা টুকু পাওয়া তা নিতান্তই সামান্য। আজ তিন দিন সে ভালো করে খায় নি, ঘুমোয় নি। দেখলে পাগলী বলেই মনে হয়। গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে আর কিছু সাহায্যের পয়সা দিয়ে আজ রতনের অপারেশন এর জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু ভগবানের মুখ পানে চেয়ে থাকা। নিস্তেজ শরীর। ক্লান্ত অবসন্ন। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা টুকু ও নেই। এতক্ষণ যেন কোন মায়া বলে ছুটে চলেছিল সে। ওটির লাল রঙের বাতিটার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠলো। হাজার বছরের ঘুম নামল তার চোখে। মাটিতেই ঘুমে লুটিয়ে পড়ল তার অবচেতন দেহ।
হাতের উপর কেউ পা দিয়ে পেরিয়ে গেল। তারই ব্যথায় উঠে পড়ল সে।হাতের ব্যথার দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ধড়ফড় করে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে গেল তার।পেটে খিদের সমুদ্র তোলপাড় করে উঠলেও, চোখের সামনে অন্ধকার। পয়সা নেই।নেই শরীরের শক্তি টুকু ও। ক্ষুধার্ত পেট কি আর সে কথা বোঝে? অথচ মনের মধ্যে তখনও তার স্বামীর চিন্তা। নার্স এসে বলল, রতনের বাড়ির কেউ আছেন? হ্যাঁ। বলে মুখ তুলে তাকালো রাধা। মুখে তার প্রগাঢ় চিন্তার স্পষ্ট ছায়া। চোখে একরাশ কৌতুহল। ওনার অপারেশন হয়ে গেছে। ওনাকে বেডে দেওয়া হয়েছে। আপনি ভেতরে আসুন। কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে ভেতরে গেল রাধা। আজ অনেক দিন পর রতন কে সে দেখল। চোখ দুটো জ্বালা করছে তার। বুকের ভেতর টা ঠুকরে কেঁদে উঠল। এই কদিনেই শরীর ভেঙে গেছে তার। ডান পা টাও কেটে বাদ দিতে হয়েছে। ডাক্তার বলে গেছেন তাকে যেন কোন মতেই উত্ত্যক্ত না করা হয়। তাই নিঃশব্দে চোখের জল মুছে রতনের পাশে এসে বসল রাধা। তার হাতের আঙ্গুল গুলো রতনের মাথার উস্কো খুস্কো চুল গুলোর ভেতর চালনা করল। রাধা জানে ভবিষ্যতে তাদের জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। বসত ভিটে টুকু ও বিক্রি করতে হয়েছে। অন্নসংস্থানের ও কোন ব্যবস্থা নেই। পথে নামা ছাড়া আর যে কোন উপায় নেই। কিন্তু এই মানুষটিকে নিয়ে কি ভাবে কাটাবে? এখান থেকে ছুটি হলে, কোথায় গিয়ে রাখবে তাকে? এসব ভাবতে ভাবতে সে রতন এর কাছ থেকে সরে গিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগলো। হাসপাতালের ঝুল জমে থাকা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠলো, হে ঈশ্বর!
আজ রতনের ছুটি হয়ে গেছে।দীর্ঘ দু মাস রোগ ভোগের পর আজ হসপিটালের চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে দুজনেই। শরীরের শক্তি প্রায় নিঃশেষ। এই দু মাস রাধা ভিক্ষে করে যা পেয়েছে তাই দুজনে মিলে খেয়েছে। যেদিন সেরকম কোন কিছুই জোটে নি সেদিন স্বামীকে খাইয়ে নিজে অভুক্ত থেকেছে। কিন্তু তার স্বামীকে জানতে পর্যন্ত দেয় নি। কোন দিন আধপেটা খেয়ে কোন দিন শুধু মাত্র জল খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে সারাদিন। এই দু মাসের অভিজ্ঞতা তার জীবনে এনেছে বার্ধক্যের ছায়া। কপালে এঁকেছে বলিরেখার চিহ্ন। হসপিটাল ছেড়ে তারা বড় রাস্তা ধরল। দশ টা এগারোটার রোদ যেন আগুন হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। জনবহুল রাস্তা যেন খাঁ খাঁ করছে। রতন খুব তৃষ্ণার্ত বোধ করছিল। একটা বাড়ির বারান্দায় রতন কে বসিয়ে রাধা ছুটল জল আনতে। এতো কিছুর পরেও স্বামীর প্রতি রাধার ভালোবাসা একটু ও কমেনি। জল ভর্তি করার পর রাস্তা পার হতে হবে, এমন সময় হঠাৎ তার মাথাটা বনবন করে ঘুরে গেল। মূহুর্তে ঝাপসা হয়ে উঠল চারপাশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটা গাড়ি ধাক্কা মারল। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রাধা। সমস্ত শরীর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। তার অন্তরাত্মা চিৎকার করে উঠলো, “ভগবান তুমি আমার মৃত্যু দিও না। আমি মরেও শান্তি পাব না। আমি কার কাছে আমার স্বামীকে রেখে নিজের মৃত্যু কামনা করব? এই জটিল পৃথিবীতে আমার রোগগ্রস্ত পঙ্গু স্বামীর আমি ছাড়া যে আর কেউই নেই। যদি একান্তই আমার প্রাণের প্রয়োজন হয় তাহলে আমার আগে আমার স্বামীর জীবন নেন প্রভু। যাতে মৃত্যুর পর আমি একটু শান্তি পেতে পারি।”রতন রাধা রাধা করে চিৎকার করে উঠলো। ততক্ষণে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। রতন ও কোন রকমে তার কাছে এগিয়ে এসেছে।রাধার রক্তে ভেজা মাথা খানি তার কোলের উপর নিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদছে। পাশের একজন বলে উঠল, ইস্!! কি মর্মান্তিক মৃত্যু!! রতন চিৎকার করে বলতে লাগল মৃত্যু নয়, মৃত্যু নয়। হতভাগী মুক্তি পেয়েছে। মুক্তি।
“কাল কেউটের ফনায় নাচছে লখিন্দর এর স্মৃতি,
বেহুলা কখনো বিধবা হয় না এটা বাংলার রীতি। ভেসে যায় ভেলা এবেলা ওবেলা একই শব দেহ নিয়ে।
আগেও মরেছি আবার মরব প্রেমের দিব্যি দিয়ে। জন্মেছি আমি আগেও অনেক মরেছি তোমারই কোলে
মুক্তি পাইনি শুধু তোমাকেই আবার দেখব বলে।”

–পার্থসারথি দত্ত

নারীর অভিলাষ – ভাগ -১

Parthasarathi Dutta
Story by Parthasarathi Dutta

আলোর শেষ রশ্মি টুকু পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিয়ে সূর্য টা তলিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমের অতলে। পাখিদের কন্ঠে তখন ঘরে ফেরার গান। কমলা রঙের আলোয় উদ্ভাসিত আকাশ। আর পাহাড়ের তখন স্নিগ্ধ আলোর স্নান। এখনই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামবে।
আলতো হাওয়া লুটিয়ে পড়ছে ঘাসের ওপর। সারাদিনের ক্লান্ত অবসন্ন শরীর সে বাতাসে নিজেকে সিক্ত করছে। মাথার ঝুঁড়ির বোঝা বাড়ির উঠোনে নামিয়ে, আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল বছর পনেরো ষোলর এক তরুনী। নাম তার ঠিক আমিও জানি না। মা’ই যখন নেই তখন কে দেবে তার নাম? কে ডাকবে নাম ধরে? গ্রামের মানুষ দশরথের মেয়ে বলেই জানে। জন্মের পর মা কে দেখেনি। তার জন্ম দিতে গিয়েই মা যে মারা গেছে। (যদিও তার বাবা তাকে জন্ম থেকেই রাধা বলে ডাকে।)
এখনও, এখানে বাড়িতেই বাচ্চা প্রসব হয়। ধাইমার মাধ্যমে সেই কাজ সম্পন্ন হয়। এখান থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। যোগাযোগের মাধ্যম বলতে পায়ে হেঁটে আর না হয় সাইকেলে চেপে। কারও অসুখ হলে খাটিয়াতে নিয়ে কাঁধে করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। সে এক দুর্যোগের রাত। মা তার প্রসব বেদনায় ছটফট করছে। শরীরের ভেতরের জলের ঘর ফেটে গেছে, কিন্তু বাচ্চা কোন ভাবেই প্রসব হয় না। ধাইমার আপ্রাণ চেষ্টা। পেট থেকে নীচের দিকে বাচ্চা কে পুশ করতে থাকে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর। আর তার চিৎকার যেন কালো মেঘের বুকে ফাটল ধরিয়ে বিদ্যুতের হাহাকার নিয়ে আসছে। তার কষ্ট, বেদনা জল হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। এভাবে কিছুক্ষন চলার পর তার কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। কিন্তু চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় মা এর জীবন ঘড়ির কাঁটা। মায়ের ভালোবাসা পাওয়া এ জন্মে তার আর হয়ে ওঠেনি। বাবার কোলে পিঠে চড়ে মানুষ হয়েছে সে। কিন্তু যে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, সেই সংসারে বাবার ভালোবাসাও বেশি দিন কপালে জোটে নি। তার বয়স যখন বারো তেরো তখনই তার বাবা পড়ল যক্ষ্মা রোগে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাই বনের কাঠ-পাতা তুলে এনে বাজারে বিক্রি করে সংসার চলত। বনের গাছ কাটা তো নিয়ম করে বন্ধ ছিলই, ভরসা ছিল কেন্দু পাতার ওপরে কিন্তু সরকার নির্দেশ জারি করে কেন্দু পাতা আর তোলা যাবে না। শুরু হয় পেটের টান। অন্ধকার ঘনায় মনের মধ্যে।প্রতিদিন সূর্যের আলো এ গ্রামে এসে পৌঁছয় ঠিকই, কিন্তু সে আলোয় অভাবের অন্ধকার দূর করতে পারে না। চৌদ্দ পনেরো বছরের বালিকার পা দুটি হতাশায় পথ খুঁজে বের করতে পারে না।মাথার উপর সংসারের বোঝা। একটা হাত ও পাই না, যে হাত তার মাথায় রেখে বলবে, ভয় কি আমি তো আছি। নিজেকেই সাহসে ভর করে উঠতে হয়। মাঠে মাঠে ঘুরে সারাদিন গোবর সংগ্রহ করে, তা দিয়ে ঘুঁটে পাকিয়ে বিক্রি করে। এভাবেই চলতে থাকে তাদের সংসার। আকাশে চাঁদ ওঠে। কিন্তু তার আলো এই হতভাগ্য পরিবারে এসে পৌঁছয় না। রাত জাগা চোখ দুটো অমাবস্যার প্রহর গোনে। চাঁদের আলো ব্রাত্য হলেও অমাবস্যার অন্ধকার রাতে তারাদের ক্ষীণ আলো জাগিয়ে রাখে বাঁচার আশা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
আজ তাকে দেখতে এসেছে। ছেলেটির নাম রতন। পাশের গ্রামের বাসিন্দা। ট্রেনে হকারের কাজ করে। ছোট বেলায় সেও মা বাবাকে হারিয়ে কখনো চায়ের দোকানে কাজ করে, কখনো হোটেলে বাসন মেজে পেট চালাত। আর এখন ট্রেনে চা বিক্রি করে। সারাদিনের উপার্জনে অন্তত খাওয়া পরার খুব একটা অসুবিধা হবে না। তার বাবা গ্রামের মানুষ দের বলে কয়ে ব্যবস্থা করেছে। তার ইচ্ছে মারা যাওয়ার আগে অন্তত মেয়েটার একটা গতি করে দিয়ে সে যেন মরতে পারে। না হলে এই মা মরা মেয়ে টার প্রতি অনেক অন্যায় করা হবে। কি জানি ভগবান ও সে পাপের ক্ষমা করবেন কি না। মেয়েটি ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। অভাবের সংসারে এই সব ঘটা করার কি খুব দরকার ছিল? তাছাড়া তার বাবা কেই বা কে দেখবে? এই তো কদিন আগে,অনেক কষ্টে আর গ্রাম দেবতার মানত করে তার বাবা ভালো হয়ে উঠেছে।দু বেলা ঠাকুরের মাদুলি ধোয়া জল খাইয়েছে । গ্রাম দেবতার পূজোর দিন সকাল থেকে উপোস করে দন্ডি কেটেছে।তার পর ঔষুধ পত্র তো আছেই। কত ডাক্তার, কবিরাজ। কত রক্ত পরীক্ষা, কফ পরীক্ষা। তবেই না তার বাবা ভালো হয়ে উঠেছে। গ্রামের লোকেরা বলেছিল পাঁঠার যকৃৎ খাওয়ালে নাকি এ রোগ খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়। অনেক কষ্ট করে পয়সা জমিয়ে সে বাবার জন্য পাঁঠার যকৃৎ নিয়ে আসত। বাবা ছাড়া এ পৃথিবীতে তার যে আর কেউ নেই। তার মা’র মৃত্যুর পর তার বাবা’ই তাকে কোলে পিঠে মানুষ করেছে। শুধু মাত্র সন্তানের সুখের জন্য সেই মানুষ টা আর বিয়ে পর্যন্ত করেনি। গ্রামের মানুষ জন কত বুঝিয়ে ছিল কিন্তু দাশু সে কথা কানে তোলেনি। দাশুর শরীর এখন ও বড় দুর্বল। উঠে দাঁড়ালে কঙ্কাল সার দেহের হাড় গুলো একটা একটা করে গোনা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না।সবুজ শিরা গুলি শরীরের উপর নানা কারুকার্য তৈরি করে রেখেছে। বাবা কিন্তু তার কথা কানে তোলে নি। আর তাই পাত্র পক্ষ আজ তাকে দেখতে এসেছে। পুরনো একখান কাপড় পরে সকল কে প্রণাম করে সে সামনে এসে বসল। লজ্জা রাঙ্গা মুখ কি যেন এক খুশিতে উন্মাদ। ঘর ভর্তি অন্ধকার। হ্যারিকেন এর ক্ষীণ আলো। নিস্তব্ধতা যেন বিরাজ করছে ঘর জুড়ে। বামুন ঠাকুর হ্যারিকেন টাকে হাতে নিয়ে একটু উপরে তুলে বলল, নাও মা একটু মুখটা তোল তো। লজ্জা ভয় মিশ্রিত একটা মুখ। কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সেই চুরি যাওয়া আলোয় , বক্র দৃষ্টিতে চোখাচোখি হল দু’জনের। আকাশের অন্ধকার ভেদ করে শুকতারার আলো এই প্রথম এসে পড়ল তার চোখে। অন্তঃসলিলা ফল্গুনদীর মত তার মনের ভেতরের সুপ্ত বাসনা গুলি ছুটে চলেছে, দ্বিগ্বিদি্ক জ্ঞান শুন্য হয়ে।
“আজ ছুটে চলে নদী সাগরের সন্ধানে,
দেখো মাতাল বাতাস আছড়ে পড়ছে
হৃদয়ের মাঝখানে।
মন বীনা আজ ঝংকারে ওঠে,
কে দিল তাহাতে টান?
পাথর চীরিয়া নামিছে বাজিয়া
ঝর্ণার কলতান ।”

আজ রাধার মন ভালো নেই। অভাবের সংসারেও তার মুখের হাসির কোন দিন খামতি ছিল না। কোন দিন কোন অভিযোগ ছিল না তার স্বামীর প্রতি। জীবনের অনেক না পাওয়া গুলো নিয়েও সে বেশ সুখীই ছিল। কিন্তু সংসারে এমন কিছু না পাওয়া আছে যার দুঃখ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এক দম্পতির জীবনে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কিছুই হয় না। এক জন নারীর কাছে মা না হওয়ার যন্ত্রণা যে কি তা একমাত্র সেই নারীই জানে। ভগবানের কাছে তার একটাই অভিযোগ, কেন এই মাতৃত্বের স্বাদ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তার জন্মের পর তার মা কে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সে কোন অভিযোগ করে নি। বিধাতার অতুল ঐশ্বর্য,জগতের সব চেয়ে মূল্যবান সম্পদই তার জন্মের পর কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তা ও তার কোন অভিযোগ নেই। অবশ্য তার বাবাও তার মায়ের অভাব টুকু কোনদিন বুঝতে দেয় নি। গ্রামের কতজন বলেছিল, দাশু তুই একটা বিয়ে করে নে। তুই ও বাঁচবি আর তোর এই মা মরা মেয়েটাও একটু স্নেহ ভালোবাসা পাবে। মেয়ে কে মানুষ করতে হবে তো? কিন্তু তার বাবা সে কথা কানেই তোলেন নি।
মাতৃ স্নেহ নাই বা দিলে, কিন্তু মাতৃত্বের স্বাদ থেকে কেন বঞ্চিত করেছো ঠাকুর? আমি তো কোন অন্যায় করিনি। কোন পাপ ও করিনি। তবে কোন জন্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে? আজ পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে এ দুঃখ নতুন নয়। কত জায়গায় মানত করেছে, কত ঠাকুরের মন্দিরে ধর্না দিয়েছে।উপোস করেছে, ঠাকুরের ফুল ধোয়া জল খেয়েছ, যগ্যির কলা খেয়েছে, কিন্তু কোন ফল হয়নি। পাড়ার লোক আড়ালে কত কথাই না বলেছে। কিন্তু রাধা তার সব কষ্ট হাসি মুখে মেনে নিয়েছে। একদিন পাশের বাড়ির এক কাকিমা তো তার মুখের উপর বলে গেল, রতন তুই বরং আর একটা বিয়ে করে ফেল। এ মাগির আর ছেলে পুলে হবে বলেতো মনে হয় না। রাধা সেদিন প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিল। কিন্তু তার স্বামী কে একটু ও বুঝতে দেয়নি। বরং সেও অভিযোগের সুরে বলেছিল,কেন
তুমি বিয়ে করতে চাও না? সত্যি তো আজ এতদিন হল, কিন্তু আমি তো তোমাকে সন্তানের মুখ দেখাতে পারলাম না। রতন হেসে বলেছিল, আচ্ছা আমি আবার বিয়ে করলে তুই সুখী হবি? কেন হব না? বারে। যখন তোমার একটা বাচ্চা হবে আমি কত আদর করব। খাইয়ে দেবো। তাকে তেল মাখাবো। ঘুম পাড়াব। রতন হেসে বলেছিল পাগলী একটা। শোন, পৃথিবীতে সব কিছু ভাগ দেওয়া যায় বুঝলি, কিন্তু স্বামীর ভালোবাসার ভাগ কাউকে দেওয়া যায় না রে। তাছাড়া আমার সমস্ত ভালোবাসা, স্বপ্ন সব তোকে ঘিরে। “নতজানু হয়ে ছিলাম তখনও, এখন যেমন আছি।মাধুকরী হও নয়ন মোহিনী স্বপ্নের কাছাকাছি।ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড কর প্রেমের পদ্যটাই। বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি শুধু তোমাকেই চাই। ” হা হা হা করে হেসে উঠেছিল রতন। আর রাধা তখন রতনের বুকে মাথা রেখে খুব কেঁদে ছিল। তার সমস্ত না পাওয়া এই স্বামীর ভালোবাসায় পাওয়া হয়ে গিয়েছিল।

চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত