প্রেমের নৌকাডুবি – মধ্যাংশ – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta

#মধ্যাংশ#

অপু মেয়ে টা কে এখনও ঠিক ঠাক বুঝে উঠতে পারেনি মৃণাল। খবর টা পেয়ে অপুই ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছে। পার্কে বসে একগুচ্ছ ফুল দিয়ে সে বলেছিলো , যাও যুদ্ধে জয়ী হয়ে এসো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। অপেক্ষা করব দেশের সেবাই উৎসর্গ করা সেই মানুষ টির জন্য। দেশ বাঁচাতে সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রহরীর জন্য। যার শরীরের পারফিউমের গন্ধ নয়, ঘামের গন্ধটা আমার খুব প্রিয় লাগবে। যার শরীর এর উর্দিটা আমার মত অনেক নারীর অলংকার হয়ে থাকবে। মনে মনে অপুর জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল। হায় রে ভারতীয় নারী, তোমাদের এই আত্মত্যাগ মানুষ ভুলে যায় কেমন করে? নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষটা কে এতদূরে রেখে যে নারীরা দুশ্চিন্তায় প্রহর গোনে, তার হিসেব আমরা আর কতটুকুই বা রাখতে পারি।
তিন মাসের ট্রেনিং তার শেষ হয়েছে। আজ তাই আনন্দে আত্মহারা সে। বুকের ভেতর বাজছে তার ঘরে ফেরার গান। অপুর সেই হাসি মাখা মুখ খানি দেখার জন্য সে ব্যকুল। আজ তার মুখ খানি বারবার ভেসে উঠছে মনের মধ্যে। এক সাথে পার করা সুন্দর মুহূর্ত গুলো বারবার তার চোখে ভিড় করে আসছে। মনে পড়ছে গ্রামের মানুষ গুলোর কথা, মাটির গন্ধটা।কানে বাজছে সন্ধ্যায় মন্দিরের আরতির ঘন্টার শব্দ। সন্ধ্যা প্রদীপ, শাঁখের আওয়াজ। আর তাই ফেলে আসা দিন গুলো কে এক সুতোই গাঁথতে চেষ্টা করছে সে। ট্রেনিং এর এই তিন মাস তাদের কাছে ফোন ও রাখতে দেওয়া হয় না। সপ্তাহে শুধু মাত্র একটা দিন বাড়ির সাথে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় অফিসের ফোন থেকে। কিন্তু সেখানেও এতো ভিড় যে বাড়ির সাথেই ঠিক ঠাক কথা হয় না।আজ তিন মাস কোন যোগাযোগ নেই অপুর সঙ্গে। জানেনা কেমন আছে সে। এতদিনের প্রতিক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে।সময় যত পার হচ্ছে ততই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। আর তো মাত্র একটা স্টেশন, তার পরেই তাকে নামতে হবে। ট্রেনের সিটে বসে থাকতে পারছে না। বারবার উঠে গেটের সামনে চলে আসছে। তাকিয়ে দেখছে বাইরের জগৎ টার দিকে। কি মোহময় শান্তি গ্রামের বাতাসে। এক বুক নিঃশ্বাস টেনে মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা অনেক হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে কাটা দগদগে ঘা এর ওপর শান্তির প্রলেপ লাগলো। স্টেশনে নেমে খুঁজতে থাকে চেনা মুখ গুলো। বিপিন, অজিত, নিখিল সবাই এসেছে। আবেগ টা আজ চোখ চীরে বেরিয়ে আসছে।
খুব কাছাকাছি তারা দুজন। কিন্তু নিস্তব্ধ। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। খুঁজে পাচ্ছে না কোথা থেকে শুরু করবে। সন্ধ্যার আকাশে চৈতালি চাঁদ। কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে আলো এসে পড়ছে অপুর মুখে। অনেক দিন আগে কোন এক পড়ন্ত বিকেলে এই গাছের ওপরে নিজেদের নাম লিখে রেখেছিল দুজনে। আজ সেই গাছের গায়ে হাত দিয়ে সেটাই খুঁজছে। এত কথা বলার ছিল, কোথায় হারালো সব? আজ অপুর মুখে হাসি নেই। এ মুখ তার অচেনা। এত গম্ভীর মুখে কোন দিন সে অপুকে দেখেনি। আজ কেন বাতাস বইছে না? হঠাৎ অপু তাকে জড়িয়ে ধরল। বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে কি যেন খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। এতক্ষণ ধরে ভারি হয়ে থাকা বুকের ভেতর টা একটু হাল্কা লাগছে। গুমোট পরিবেশ যেন বাতাসের হাওয়াই ফুরফুরে মেজাজে ফিরে এলো। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোন ভাষা লাগে না। ভালোবাসার মানুষ টার চোখের দিকে তাকিয়ে মেপে নেওয়া যায় তার গভীরতা। তার মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ে ফেলা যায় প্রেমের পদ্য গুলো। অপুর মুখ খানি মৃনালের হাতে। আবেগে বুজে গেছে চোখ। তিরতির করে কেঁপে উঠছে তার ঠোঁট। আকাশের চাঁদ টাও লজ্জিত হয়ে ঢেকে গেল সাদাকালো মেঘের ভেতরে।
এভাবেই কেটে গেল অনেক গুলো দিন। এবার তাকে ডিউটিতে ফিরে যেতে হবে। তার প্রথম পোস্টিংই কাশ্মীরে। ভারতের এই শীতল বরফের জায়গাটা বহিরাগত শত্রুর সঙ্গে লড়াই এ জেরবার।
উরি কিংবা পাঠানকোটের মতো ঘটনা যে কোন সময় ঘটে যাওয়া আকস্মিক কিছু নয়। সন্ধ্যা বেলা স্টেশনে সব বন্ধুরাই ছাড়তে এসেছিল মৃণাল কে।গ্রাম থেকে দিল্লি ও দিল্লি থেকে শ্রীনগর হয়ে পৌঁছানো হল কাশ্মীর এর আর্মি ক্যাম্প এর ভেতর।
কাশ্মীর না বলে এটাকে স্বর্গ বললেই মনে হয় ভালো হয় । আর তাই এই স্বর্গরাজ্য দখলের জন্য বারবার চেষ্টা করে অসুরের দল। আর সেই অসুরদের নিধন করতে যুগে যুগে অবতীর্ণ হন ভগবান। হ্যাঁ। ভগবান ই তো। সেই ভগবান আর শত্রুর লড়াই হয় এই যুদ্ধ ভূমিতে। ভারতের বীর সেনাবাহিনীর রক্তে ভিজে যায় পুণ্য ভূমি। তবু তাঁরা অঙ্গীকার বদ্ধ দেশ বাঁচাতে। তাঁদের শক্ত চোয়াল, গ্রন্থীল পেশী আর নির্ভীক বুকের ভেতরে বাজতে থাকে,”বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী। ”

মাটির থেকে সাতশো আটশো ফুট ওপরে।এখন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাইনাস দশ কি বার। সাদা বরফের চাদরে ঢাকা কাশ্মীরের পাহাড়। গাছের ডাল, পাতা সমস্তই বরফে ঢাকা। প্রকৃতির অকৃপনতায় সৌন্দর্যের পশরা সাজিয়ে বসে আছে কাশ্মীর।
‌ কাজের চাপ এখানে ভালোই। হাতে মোবাইল ফোন থাকলেও নেটওয়ার্ক ঠিক ঠাক পাওয়া যায় না। তাছাড়া কখন কোথায় ডিউটি করতে হবে কেউ যানে না। এরই মাঝে কখনো কখনো খবরাখবর নেয়। অপুর সাথে অনেক দিন কথা হয় নি। কি হয়েছে তার কে জানে। বিপিন, অজিতের কাছে খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তারা কেউই তার খবর দিতে পারে নি। নিখিল শুধু একবার বলেছিল আজকাল খুব একটা বাইরে বেরোয় না। কলেজেও আসে না। কারও সাথেই আর যোগাযোগ করে না। মৃণাল এবার পূজোর ছুটি পায় নি। প্রথম পোস্টিং তাই ছয় মাসের আগে ছুটি পাওয়া খুব কঠিন। আগে থেকেই তাই নভেম্বর মাসে ছুটির দরখাস্ত করে রেখেছে। শীত কালটা অবশ্য ঘরে কাটানো যাবে। মাঝে মাঝে অপুর জন্য খুব চিন্তা হয় তার। খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। অনেক ভাবেই খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু কোন চেষ্টাই তার সফল হয় নি।
ছুটি তার মঞ্জুর হয়েছে। তাই আজ আবার ঘরে ফেরা। কিন্তু কেন জানি না আজ একটা অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। কোথায় যেন একটা ভয়। হ্যাঁ ভয় ই। প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয়। আজ তার মন বড় চঞ্চল হয়ে উঠেছে। জানি না কি অপেক্ষা করছে তার জন্য। জানেনা কেমন আছে তার অপু। আজ বারবার তার ফোন ট্রায় করে যাচ্ছে। কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। বিপিন কি কিছু লুকিয়ে যাচ্ছে। সে শুধু ফোন তুলে বলল, ও তুই আজ আসছিস? আয়। কোথায় যেন সুর কেটে যাচ্ছে। কেমন উদাস হয়ে গেছে মৃণাল। সময় যেন কাটতে চাইছে না। কি হয়েছে তাদের? সব ঠিক আছে তো?
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে বাড়ি পৌঁছানো। আজ এতো সকালে কেউ ই আসেনি স্টেশন এ। মস্ত একটা কাঠের বাক্স একা নামাতে হলো ট্রেন থেকে। তার পর এক টোটো ডেকে তার মধ্যে বসিয়ে বাড়ি ফিরছে। কি আছে দাদা এই বাক্সে? তোমার রাইফেল? বন্দুক? না রে বোকা এতে আপেল আছে। কাশ্মীরের আপেলের নাম শুনিস নি? ও এবার বুঝলাম। আচ্ছা যাদু বাড়িতে সবাই কেমন আছে রে? ভালো। কেন দাদা? না এমনই জিজ্ঞেস করলাম। গ্রামের সবাই কেমন আছে? বিপিন, অজিত, নিখিল সবাই ভালো আছে তো? হ্যাঁ দাদা, সবাই খুব ভালো আছে। ও আচ্ছা। আচ্ছা শোন তুই বাজারের ভিড় এ না ঢুকে বামুন পাড়ার রাস্তা দিয়ে চল। ঠিক আছে দাদা। ইচ্ছে করেই বামুন পাড়ার রাস্তা দিয়ে ঢুকল মৃণাল। যদি অপুর সঙ্গে দেখা হয়। যদি সে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে তার আশায়। তার আসার খবর নিশ্চয়ই পেয়েছে, বিপিন-অজিত এর কাছে। দূর থেকে হঠাৎ চোখে পড়ল অপুদের বাড়িতে বিয়ের প্যান্ডল। বাইরের চোখ ধাঁধানো শৌখিন গেট। কার বিয়ে রে? ও আমাদের অপুদিদির গো। তুমি জানতে না। ছেলে টা খুব বড় ডাক্তার।বিদেশে থাকে। আর কোন কথা কানে ঢুকছে না। মাথার উপর ভেঙে পড়ল আকাশ। এক লহমায় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল সব স্বপ্ন, সব আশা। বাড়ির বাইরে বরের গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা। অনেক ভিড় তাই টোটো টা দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু দাঁড়াতে হবে দাদা। মনে হচ্ছে কনে বিদায় হচ্ছে। ঝাপসা চোখে চোখাচোখি হলো দুজনের। অব্যক্ত যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠছে তার হৃৎপিণ্ড। চোখ দিয়ে ঠিকরে বেরোচ্ছে জলন্ত আগ্নেয় গিরির লাভা
।বুঝতে পারছেনা সে কি করবে, অপু যে এই ভাবে তার বিশ্বাস নিয়ে খেলবে এটা ভাবতেই তার গা শিউরে উঠছে ।একজন যখন খেলাঘর গড়ার স্বপ্নে বিভোর অন্য জন তখন খেলাঘর ভাঙ্গার যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে তার মুখ। সিঁথিতে সিঁদুর আর লাল বেনারসি শাড়ি তে কি সুন্দর মানিয়েছে তাকে।
কিন্তু সব সৌন্দর্য তো সবার জন্য নয়।সৌন্দর্য চোখ দিয়ে দেখা যায়। কিন্তু উপভোগ করার জন্য লাগে অন্তরাত্মা। সেই অন্তরাত্মার হৃদয়াকাশে আজ কালো মেঘের ঘনঘটা। ভেতর থেকে গুরু গুরু শব্দ আর বিদ্যুতের শানিত ফলায় শতছিন্ন তার মন।

‌চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত

প্রেমের নৌকাডুবি – প্রথমখন্ড – পার্থসারথি দত্ত

Parthasarathi Dutta

#প্রথমখন্ড#

সবে ল্যাপটপ খুলেছি “নৌকাডুবি” দেখব বলে। নেট থেকে কোনরকমে ডাউনলোড করলাম। ডাউনলোড স্পিড এতো কম মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যায়। মোবাইল থেকে দেখব বলে কত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। রাত্রি বেলা তো আরও স্লো হয়ে যায়। বিরক্তিকর।
আর্ট ফিল্মে রাইমার অভিনয় টা আমার প্রথম থেকেই ভালো লাগে। প্রথমেই রাইমার লিপে “খেলাঘর বাঁধতে নেমেছি।” গানটা শুনতে শুনতে “আমার মনের ভিতরে” সবে ডুবতে শুরু করেছে “নৌকাডুবি “। ঠিক সেই সময় বেজে উঠল চেনা রিংটোন। ” চেনা মুখ, ছুঁয়ে থাকা দৃষ্টি। এলোমেলো আড্ডা, চায়ের গেলাস্। ঘুম ঘুম ক্লাস রুম, পাশে খোলা জানালা। ডাকছে আমাকে তোমার আকাশ। ” এই সময় আবার কে? এতো রাত্রে? মোবাইল টা আজ একটু দূরেই রেখেছি। না হলে ফেসবুক এর নেশাটা আমাকে আবার সিনেমাটা শেষ করতেই দেবে না। অপু এত রাতে? তাড়াতাড়ি ফোন টাকে রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে উঠল হ্যালো? মৃণাল? হ্যাঁ ।বলছি বলো। শোন না বলছিলাম কি ফেসবুকে গানের লড়াই টা বেশ জমে উঠেছে। শিগগির এসো। খুব মজা হচ্ছে। না অপু। শোন। আমি কিছু শুনতে চাই না। তুমি এসো তাড়াতাড়ি। বলেই হুট করে ফোনটা কেটে দিল। আচ্ছা জ্বালাতন করে তো মেয়ে টা। একে আবার বেশি কিছু বলাও যায় না। মুখ ফুলিয়ে, রাগ দেখিয়ে, যাচ্ছে তাই কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। বড় লোক বাপের অভিমানি মেয়ে। আমাকে কি বাড়ির কাজের লোক পেয়েছে নাকি? যখন যা বলবে শুনতে হবে। সেদিন ওরকম হঠাৎ বিকেল চারটেতে ফোন করে বলে কফি সপে আসতে হবে। আব্দার আর কি? কত করে বললাম শোন অপু আমার পাঁচ টা থেকে টিউশন ক্লাস আছে। সব ছেলে মেয়েরা এসেপড়বে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। দুম করে বলে ফেলল অত শত বুঝি না। আমি অপেক্ষা করছি। তোমাকে আসতে হবে। একদিন তো রাত দুটো তে ফোন করে বাইনা শুরু করে তাকে এত রাত্রে ফোক কিংবা ভাটিয়ালি শোনাতে হবে। মামা বাড়ির আব্দার? ল্যাপিতে তখন “বাহিরের খেলায় ডাকে সে, যাব কি করে” সুরটা ভেসে উঠল। থাক আজ না হয় “নৌকাডুবি”তেই মনঃসংযোগ দিই। অপু কে না হয় পরে মানিয়ে নেওয়া যাবে।
‌ অপুর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ কলেজের নবীন বরন উৎসবে। সেদিন সন্ধ্যায় পটাদা এসেছিলেন আমাদের কলেজে। অনেক গুলো গানের সাথে আমার ভালোলাগার ” তোমায় দিলাম আজ ” গানটা ও গাইলেন। এর পর আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন আমরা কেউ যদি ওনার সাথে গান ধরি। অগত্যা বন্ধুরা সবাই মিলে আমাকে বলির পাঁঠা করল। স্টেজে উঠে আমি আর পটাদা শুরু করলাম “কলঙ্কিনী রাধা “। গান শেষে পটাদার সাথে হাত মেলাতে গিয়ে তাঁর হাতে চিমটি কেটে দিলাম। স্টেজ থেকে নামতে গিয়ে দেখি একটি মেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার সাথে পরিচয় করতে এগিয়ে এসেছে। গানটা নাকি ওর খুব পছন্দের। আর আমি নাকি খুব সুন্দর ভাবে গেয়েছি। ধন্যবাদ বিনিময়ে কথোপকথন শেষ করব হঠাৎ মেয়ে টা বলে বসল একটা অনুরোধ আছে যদি রাখেন? হ্যাঁ অবশ্যই। বলুন কি করতে হবে। না। সেরকম কিছু না। আসলে পটাদার একটা সিগনেচার চাই। এই ডাইরির মধ্যে। হ্যাঁ দিন। বলে ডাইরি আর কলম টা নিলাম ওর হাত থেকে। তারপর কলেজ এ প্রায় মাঝে মধ্যে দেখা হয়। একদিন ক্যান্টিনে বসে টেবিল বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করেছি হঠাৎ মেয়েটি ঢুকল। একটা মিষ্টি হাসি তার মুখে ঝলমল করে উঠলো। আমি হাঁদা বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে বেরিয়েও গেল। সেদিন কলেজ ছুটির পর বাসের অপেক্ষা করছি, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে । দেখি সে বৃষ্টি তে ভিজে ছুটে আসছে। তাকে দেখে আমার আবার হার্টবিট বেড়ে যায়। কাছে দাঁড়িয়ে অভিযোগের সুরে বলল আপনি মোটেও ভালো লোক নন। আমি তো হতচকিত হয়ে পড়লাম। কিন্তু কেন? মেয়েদের দেখে একটা সাইলেন্ট স্মাইল দিতে হয় সেটুকুও জানেন না। যাক বাবা ধড়ে প্রান এলো। আমি মাথা চুলকে বললাম হবে হয়তো। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে আমি সত্যিই খুব ভয় পেতাম। ঠিক ভয় না। আড়ষ্টতা বলতে পারেন। অপুর জন্যই অনেক টা সাবলীল হয়েছি। কথোপকথনের মাঝে নিজেদের পরিচয় হলো। আমি অপু মানে অপরাজিতা চ্যাটার্জি। ও। আমি…..। থাক আর বলতে হবে না। আপনি মৃণাল সেনগুপ্ত। হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে? জানতে হয় মশাই। আপনি বাংলা অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আমি ফার্স্ট ইয়ার। বাংলা অনার্স। ও আপনিও বাংলা অনার্স? হ্যাঁ। যাক তাহলে সাহিত্য রসের অভাব হবে না? হ্যাঁ। পুরো রসগোল্লা। ও, বুঝলাম। তা কোলকাতার রসগোল্লার নাম আগে শুনেছি…… আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে উঠল কোলকাতার রসগোল্লা নই মশাই ভোলা ময়রার রসগোল্লা। দুজনে একসাথে হেসে উঠলাম।
‌ সেদিন প্রথম কলেজ কাট করে দুজনে মিলে সিনেমা দেখতে গেছি। ওই দুটো টিকিট কেটে এনেছিল। এই প্রথম দুজনে খুব পাশাপাশি। আজ প্রথম হাতধরে হাঁটা। সিনেমা দেখতে দেখতে হাতে হাত রাখা। ভালোবাসার প্রথম স্পর্শ। আমি চোরা বালিতে তলিয়ে যাচ্ছি। খুব ভয় করছে আমার, ঠিক ঠাক তল খুঁজে পাব তো? আমি ওর হাতটা খুব আলতো করে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কি হচ্ছে? ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। চোখে চোখ রেখে অনেক না বলা কথা বলে দেওয়ার চেষ্টা করল ।সেদিন রাত্রে আমি ঘুমোতে পারিনি।জীবনে কখনো দু নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না। আমার লক্ষ্য, আমার ভবিষ্যৎ আলাদা। আমি টিউশন পড়িয়ে কয়েকটা টাকা রোজগার করে সংসার চালাই সাথে নিজের পড়াশোনা। আর ও বড়লোক বাড়ির মেয়ে। এসব কথা ও কোন মতেই শুনতে চাই না। বুঝতে চাই না আমরা দুজন ভিন্ন মেরুর। অভাবের সংসারে ভালোবাসার জায়গা হয় না। তার বাবা হয়তো মনে মনে কোন রাজপুত্রের সন্ধান করছেন। ভিখিরি হয়ে সে রাজপ্রাসাদে ঢোকার দুঃসাহস দেখানোর ইচ্ছে আমার নেই।
‌ সেদিন অনেকক্ষণ পার্কে বসে ছিল দুজনে।অপুই জোর করে ফোন করে ডেকে এনেছে মৃনাল কে। ইদানিং মৃনাল খুব এড়িয়ে চলছে। আগের মত সে আর নেই। কি যেন হয়েছে তার। হঠাৎ কেমন করে সে যেন পাল্টে গেছে। অপু তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে তোমার? কৈ কিছু না তো। না বললেই হলো। আমাকে বলো প্লিজ। কি যেন একটা অপরাধ বোধ কাজ করছে তার । আজ অপুর চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই। শেষ পর্যন্ত মনে জোর এনে বলেই ফেলল। শোন অপু মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে বা দেখাতে আমি পছন্দ করি না। আমার বর্তমান বা ভবিষ্যৎ তুমি খুব ভালো করেই জানো। শুধু তাই নয়, আমি কিন্তু কখনো তোমার যোগ্যও নই। আমার ইচ্ছে গান বাজনা বা গ্রাজুয়েট হওয়া নয়। আমি চাই ডিফেন্স লাইনে যুক্ত হতে। দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছে আমার ছোট থেকে। আমার জীবনের সাথে নিজের জীবন টাকে জড়িয়ে অভিশপ্ত করে ফেলোনা। তাতে কি? আমি কি তোমাকে বারন করেছি? তোমার স্বপ্ন, সে তো আমার ই স্বপ্ন। আহ্। কি যা তা বলছ? হ্যাঁ ঠিক ই বলছি।
‌ ছোট থেকেই মৃনালের ইচ্ছে ছিল ডিফেন্স এ যুক্ত হওয়া। দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছে তাকে খুব নাড়া দেয়। আর তাই কলেজ আর টিউশন এর ফাঁকে সে ফর্ম ভরতো ডিফেন্স এর। সকাল সন্ধ্যা দুবেলা নিয়মিত মাঠে যেত। নিয়মিত শরীর চর্চা করতো। কয়েক বার লাইনে গিয়ে ঘুরেও এসেছে। কখনো সময়ে মাঠ কমপ্লিট করতে পারে নি। তো কখনো বুকের ছাতির জন্য বাদ পড়তে হয়েছে। কিন্তু সেদিকে ওর ভ্রুক্ষেপ নেই। চেষ্টার কসুর করে না। আর্মি হওয়ার নেশাটা তাকে পেয়ে বসেছে। খুব শীঘ্রই একটা লাইন আছে। এবার তাকে কোয়ালিফাইড করতেই হবে।
‌ না। এবার তার পরিশ্রমটা বিফলে যায়নি। এবার খুব ভালোভাবেই নিজের যায়গাটা পাকাপাকি করে নিয়েছে। আজ জয়েনিং লেটার হাতে পাওয়ার পর তার খুব আনন্দ হচ্ছে। যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। দেশের সেবাই নিজেকে উৎসর্গ করার আনন্দ। আজ খুব ইচ্ছে করছে পুরো গ্রাম, মাঠ ঘাট, বনের মধ্যে সেই খুশিটাকে ছড়িয়ে দিতে। তার টিউশন এর ছেলে মেয়ে দের মিষ্টি খাইয়েছে। আজ তার চোখ ভিজে আসছে বারবার। এই ছোট ছোট মুখ গুলো বারবার ভেসে উঠছে তার চোখে।আর তো তাদের প্রতি দিন দেখতে পাবে না। তাদের চিৎকার, চেঁচামেচি, হৈ হুল্লোড়। কোন কিছুই আর ফিরে আসবে না। মনে পড়ছে তাদের নিয়ে পার করে আসা অনেক সুখ স্মৃতি। মনে পড়ছে বিকেলের ফুটবল। চায়ের দোকানের আড্ডা। আর সেই গ্রামের মানুষ গুলোর কথা। যাদের সময় অসময় পাশে দাঁড়িয়েছে। যাদের কোন কিছু হলে রাত্রেও ছুটে বেরিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ভরসা যুগিয়েছে। নিজের যৎসামান্য উপার্জনের কিছু তাদের জন্য বিলিয়ে দিয়েছে। যে গ্রাম ছেড়ে সে একটা দিন ও বাইরে কাটায় নি, সেই গ্রাম ছেড়ে তিন মাস? পুনেতে তার ট্রেনিং। এই তিন মাস তাই সব কিছুই তাকে ভুলে যেতে হবে।
‌চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত

শিবদুর্গাই ভোলানাথ ধামের আকর্ষণ – শোভন সাধু

Sovon Sadhu
Sovon Sadhu
Sovon Sadhu
শিবদুর্গাই ভোলানাথ ধামের আকর্ষণ
শিবদুর্গাই ভোলানাথ ধামের আকর্ষণ

গন্ধবণিক সম্প্রদায়ভুক্ত, এই পরিবারের সদস্যেরা হলেন চণ্ডীমঙ্গলের ধনপতি শ্রীমন্ত সদাগরের বংশধর। তাই এই বংশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে শিবপুজো।

ডাকের সাজের এক চালির প্রতিমা
কোথাও দশভুজা, কোথাও অভয়াদুর্গা বা হরগৌরী। এমনই রূপবৈচিত্রে অনন্য বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব। কলকাতায় যে কয়েকটি পরিবারে শিবদুর্গা পুজোর প্রচলন রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম বিডন স্ট্রিট ভোলানাথ ধাম।

ভোলানাথ শিবদুর্গা
ভোলানাথ শিবদুর্গা

গন্ধবণিক সম্প্রদায়ভুক্ত, এই পরিবারের সদস্যেরা হলেন চণ্ডীমঙ্গলের ধনপতি শ্রীমন্ত সদাগরের বংশধর। তাই এই বংশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে শিবপুজো।

এই পুজোর সূচনা হয় ১৯০৫-এ বারাণসীতে। পুজো শুরু করেন ভোলানাথ দত্ত। সেখানে আট বছর পুজো হওয়ার পরে কলকাতার শোভাবাজারে গোলক দত্ত লেনের বাড়িতে পুজোটি স্থানান্তরিত হয়। সেখানে ১৯২৪ পর্যন্ত পুজো হয়। এর মধ্যে ১৯২২-’২৩ নাগাদ বিডন স্ট্রিটের বসতবাড়িটি অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের পরিবারের কাছ থেকে কেনা হয়। সংস্কারের পরে সেখানেই পুজোটি স্থানান্তরিত হয় ১৯২৫-এ। সেই থেকে বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে পুজো হয়ে আসছে।

ডাকের সাজের এক চালির প্রতিমা। পরিবারের প্রবীণ সদস্য অজয় দত্ত বলছিলেন, ‘‘এখানে শিবের কোলে দুর্গার অধিষ্ঠান। এই পরিবারে শিবকে জামাই হিসেবে পুজো করা হয়। আর দুর্গা যেন বাড়ির মেয়ে।

এক খিলানের চওড়া প্রশস্ত দালানে পুজো হয়। মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদে হয় বোধন। সেই থেকে নবমী পর্যন্ত চলে চণ্ডীপাঠ।

ব্যবসায়ী পরিবার বলেই বিজয়া দশমীর দিনে পুজো শেষ হলে তবেই দোকান খোলা হয়। অব্রাহ্মণ পরিবার তাই অন্নভোগের প্রচলন নেই। সকালে চালের নৈবেদ্য ফল, মিষ্টি আর রাতে থাকে ঘিয়ে ভাজা লুচি, ভাজা আর নানা ধরনের মিষ্টি।

এই পরিবারের কুমারী পুজো হয় তবে তার কিছু বিশেষত্ব আছে। পুরোহিত নয়, কুমারীকে পুজো করেন বাড়ির সধবা মহিলারাই। এ ছাড়াও হয় ধুনো পড়ানো।

–শোভন সাধু

লেবার ট্রেন – ১ম পর্ব – শুভ্রজিত মুদি

Subhrajit Mudi
Subhrajit Mudi

লেবার ট্রেন

—শুভ্রজিত মুদি

 ১ম পর্ব, সকাল ৭:০০ ; রামকানালী স্টেশন ভিড়ে ঠাসা । দুই প্ল্যাটফর্মের রামকানালীকে এখন ছোট শেয়ালদহ স্টেশন বলা যেতেই পারে । একে একে মহিলা, পুরুষ, পড়ুয়া, অফিস যাত্রীর ভীড়ে স্টেশন চত্তর আর দেখা যায় না । বার্নপুর, আসানসোল যাবে সবাই । কিছুজন কলেজ পড়ুয়া ছাড়া বেশির ভাগটাই কাজের সন্ধানে সকাল হতেই বেরিয়ে পড়েছে । তাতে পুরুষের ভাগটা বেশি হলেও মহিলারা পিছিয়ে নেই । কিছু কিছু যায়গায় জটলা বেঁধেছে । গোল করে ঘিরে বসে আছে সবাই । কেউ কেউ উচ্চশ্বরে হিসাবের পয়সাটা বুঝে নিচ্ছে । কেউ বা লোক ঠিক করছে সাথে নিয়ে যেতে । এদেরও মোটামুটি অলিখিত দলাদলি চলে । কেউ কেউ বাড়ির চাষ করা শাক-সবজি নিয়ে যাচ্ছে বিক্রি করতে । কেউ পুকুর, বন, পাহাড় থেকে রকমারি ফুল, বেলপাতা, কেঁদু পাতা, কালমেঘের চারা, অনন্তমূল, পদ্মফুল নিয়ে যাচ্ছে শহরের চাহিদা মিটিয়ে নিজের অভাবের সংসারের প্রয়োজন টুকু মেটাতে । কিছু মহিলা পুকুরের ধরা চুনো মাছ, শামুক, শালুক ডাটা নিয়ে যাচ্ছে । কিছু মানুষ কারখানায় কাজ করে । এই কর্মব্যস্ত সকালে ভীড়ের নব্বই শতাংশ মানুষ যাচ্ছে দিন মজুর আর রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে । দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সবার পেশা মোটামুটি স্থির । কিছু অদক্ষ, অনভিজ্ঞ যুবক, পৌঢ় শহর তলির বাবুদের দৈনিক প্রয়োজন মতো কাজ করে । কোনো দিন কেউ ডাকে বাগান পরিষ্কার করতে, কেউ বা ডাকে ঘর পরিষ্কার করতে, কেউ বা ডাকে পাড়ার নালি পরিষ্কার করতে । সবাই যে কাজ পায় এমনটাও নয়, অনেকে ফিরে আসে কাজ না পেয়ে । অনেকে শহরের বড়ো বড়ো ঠিকাদারদের শ্রমিক যোগান দেওয়ার কাজ করে । তাই তাদেরকে ঘিরে ষ্টেশন চত্তরে সবাই অস্থির ভাবে আজকের দিনের কাজ পাকাপাকি করতে ব্যস্ত । অনেক দুর থেকেও মানুষ আসে কাজ করতে, তবে ট্রেনটা ভর্তী থাকে মুলত জয়চন্ডীপাহাড়, বেরো আর রামকানালী ষ্টেশনের কাছাকাছি গ্রামগুলির শ্রমিক দিয়ে । অনেকে এই ট্রেনটিকে ‘লেবার’ ট্রেন বলে । ষ্টেশনের কোলাহলের মাঝেই হঠাৎ সশব্দে বেজে উঠল “বাঁকুড়া থেকে আসানসোল যাওয়ার ট্রেন ২ নং প্ল্যাটফর্মে আসছে ।” এবার দেখলাম সবাই চলাফেরা করতে শুরু করে দিল নিজনিজ অলিখিত দলে যোগ দিতে । ভিড় দেখে বোঝাই যায় না সারাদিন এই স্টেশনটি নিসঙ্গতায় ঝিমিয়ে পড়ে । একাকিত্বতা নিয়ে অপেক্ষা করে পরের সকালের, সেই ‘লেবার’ ট্রেনের । আমি বসে বসে সবটা দেখছি বেশ কিছুদিন ধরে । কারণ আমিও এখন নিত্ত যাত্রী হয়েছি । ট্রেন ঢুকতেই সবাই হুড়হুড় করে উঠে গেল অসহায় ট্রেনে । বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রোজ এই অত্যাচার সহ্য করে । ট্রেনে উঠার পর ঘাড় ঘোরানোর জায়গা থাকে না । ট্রেনটি অনেক কষ্টে সিটি বাজিয়ে এগিয়ে চলল শহরতলির দিকে । শহরতলির গলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়বে এই ভিড় । আমার সখ্যতা হয়েছে কিছু যাত্রীর সাথে । তারা সবাই রাজমিস্ত্রী, বয়সে আমার দ্বিগুন কেউ বা তিনগুন হবে । চারজনের সিটে অনায়াসে তারা নয় জন বসতে পারে । আমি উঠে ভিড় ঠেলে তাদের কাছে গিয়ে দাড়াতেই একটু পা চেপে আমাকেও বসার জায়গা করে দিল । পিঠের ব্যাগটা রেখে আমিও সানন্দে বসে পড়লাম । জানালায় তাদের টিফিন বোঝাই থলি ঝোলানো । বাড়ীতে পেটভরে খেয়ে এসেছে, সাথে খাবার নিয়েও যাচ্ছে । বাইরে পেটভরে খেতে অনেক টাকা লাগে । সারাদিনের মজুরির এক টাকাও তারা বাজে ভাবে খরচ করবে না । সিটের নিচে তাদের গাইতি, কোদাল, হাতুড়ি, রাজমিস্ত্রীদের বিভিন্ন কাজের যন্ত্রপাতি রাখা । আমার খুব ভালোলাগে এদের সাথে যেতে । প্রথম দিন চুপচাপ এদের সামনে দাড়িয়ে থেকেছি । তাদের নিঃস্বার্থ সরলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে । তাই দ্বিতীয় দিন তাড়াতাড়ি করে তাদের কাছেই গিয়ে উঠেছি । ওদের ট্রেনে জায়গা নির্দিষ্ট । সেখানে গেলেই তাদের পুরো দলটিকে পাওয়া যায় । আমি উঠেই দেখি সমহিমায় তাদের তাসের আসর জমে উঠেছে প্রতিদিনের মতোই । কয়েকজন ‘কামার’ কাকুর সাথে রোজের অভ্যাস মতো লেগে পড়েছে । সে জানালার ধারে চুপচাপ বসে ঘুমোনোর চেষ্টা করলেই মাথায় গাট্টা পড়ে । তারও ভালোই লাগে । তাই হয়তো সে সবার মনোরঞ্জনের জন্য বারবার ঢুলে পড়ে । কয়েকজন আগের দিনের কাজের কথা আলোচনা করছে । তারা শহরের বাবুদের খুব ভালোভাবে চেনে, তাদের বাড়িতে তাদের তদারকিতে কাজের মাঝে তাদের চিনে নিতে শিখে গেছে । তারা মুখ দেখেই বুঝে যায় কতো মজুরি দেবে, কেমন ব্যবহার করবে । সেই সব আলোচনা চলছে । ট্রেনে প্রচন্ড কোলাহল । হঠাৎ পাশে বসে থাকা কামার কাকুর মাথায় গাট্টা পড়তেই সবাই হাহা করে সজোরে হেসে উঠল । কামার কাকুও রোজের মতো চোখ খুলে অবাক হওয়ার মতো করে সবার মুখ গুলোর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কার কাজ । কিন্তু তা বোঝার উপায় নেই । চারজনের সিটে নয়জন বসে, সামনে আরও জনা সাত দাড়িয়ে । কিছুক্ষন সবার মুখের দিকে তাকিয়ে, শুধু ফোগলা দাঁতের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল, “সব শালারা সাট আছে” । ওটা বলতেই আবার সবাই হোহো করে হেসে উঠল, সাথে আমিও । সবাই বোধহয় এটা শোনার জন্যই অপেক্ষা করে থাকে । এদের কাছে এই ঘটনাটা রোজের হলেও ওরা এমন ভাবে উপোভোগ করে যেন আজ প্রথম । এভাবেই চলে তাদের রোজের ট্রেন যাত্রা । যেদিন কোনো একজন আসে না তারা প্রত্যেকে খবর নেয়, কেন আসে নি । কারো বাইরে যাওয়ার থাকলে আগেই জানিয়ে দেয় সে কথা । এটা ওদের ভালোবাসার প্রতিফলন তা বুঝতে আমার অসুবিধা হল না । তারা প্রত্যেকে একে অপরের পরিবারের লোকজনের কথা জানে, একে অপরের প্রয়োজনে পাশে থাকে । খবর রাখে প্রত্যেকের । কিছুদিন পর জানলাম ওরা প্রতিবছর পিকনিক করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সবাই একসাথে । এবারের পিকনিকে আমিও নেমন্তন্ন পেলাম । তবে আমার কাছে ওরা চাঁদা নেবে না, ছাত্র জীবনের ছাড় বোধহয় । আমি না গেলে আমারও ফোন করে খোজ নিয়েছে বেশ কয়েকবার । তাদের প্রতিদিনের সংঘর্ষের জীবনে এতো দায়িত্ববোধ আমাকে মুগ্ধ করেছিল । বার্ণপুর আসতেই অনেকে নেমে গেলে । বেচারা ট্রেনটি প্রানে বেঁচে গেল । অনেক #সভ্য যাত্রী এই #অসভ্য যাত্রীদের চেঁচামিচি, রসিকতা, ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধ, টিফিনে ঝোলানো রসহ্যময় খাবার দেখে অনেক অস্বস্তিবোধ করছিল । ট্রেনটা খালি হতেই তারাও হাপ ছেড়ে বাঁচল । তাদের অতৃপ্ত হৃদয়ে কিছুটা শান্তির ছোয়া । লেবার ট্রেনের প্রতিটা সিট, প্রতিটা কোনা এই ‘অসভ্য’ লেবার গুলোকে খুব কাছের থেকে চেনে । প্রান বেরিয়ে যায় যায়, তবুও রোজ তাদের প্রেমে ফিরি ফিরে আসে । আসানসোল আসতেই পুরো ট্রেন ফাকা । যে যার লক্ষে দিনের শেষে কিছু হাসি সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছড়িয়ে গেল । একটা মুল স্রোত থেকে যেন অনেক শাখা প্রশাখা বেরিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে আসানসোলের অলিতে গলিতে । আমিও নেমে হাটতে শুরু করলাম । ফেরার সময় আর দেখা হবে না এদের সাথে । আমাকে আগের ট্রেনেই ফিরতে হবে । আবার অপেক্ষা পরের দিনের । আর সবার মতো আমিও যেন অপেক্ষা করে থাকি আগামী সুর্যের । একটা অকৃত্তিম ভালোবাসা তৈরী হয়েছে এই ভিড়টার জন্য, এই অসভ্য লোকগুলোর জন্য ।

চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

—শুভ্রজিত মুদি

শাহেনশাহ-ই চিকেন মাসালা – দেবাশীষ দত্ত

The Chef - দেবাশীষ দত্ত
The Chef – দেবাশীষ দত্ত
শাহেনশাহ-ই চিকেন মাসালা
শাহেনশাহ-ই চিকেন মাসালা – দেবাশীষ দত্ত

লেবু লংকা দেয়া আছে…. নজর লাগবে না ।

চিকেন, আদা, পিঁয়াজ, রসুন, জিরে বাঁটা, কাশ্মীরি লংকা গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো, গোলমরিচ, টক দই, টমেটো, গরম মসলা, তেজ পাতা, নুন, সানফ্লাওয়ার রিফাইন তেল, চিনি, সব একসাথে মাখিয়ে কড়াই এ করে ওভেন এ চাপিয়ে দিন, 30 মিনিট ওভেন এ রাখুন, 5মিনিট পর পর কোষতে থাকুন, সিম এ রান্না করুন ।

রান্না হয়ে গেলেওভেন off করেদিন, রান্না কমপ্লিট।

দেবাশীষ দত্ত 

প্রেমের পুণ্যশ্লোক

কিছু কিছু কথা বলে দেয় মুখ
কিছু কথা বলে চোখ,
কিছু কিছু কথা মনে মনে লেখে
প্রেমের পুণ্যশ্লোক!

কিছু কথা থাকে হৃদয়ে গোপন
কিছু বা প্রকাশ পায়,
কিছু কথা শুধু আপন খেয়ালে
সুরভি ছড়িয়ে যায়!

না বলা কথার তীব্র আকুতি
কখনও গানের বোলে,
শান্ত দুচোখে আনত চিবুকে
খুশির লহরী তোলে!

কিছু নীরবতা পুষে রাখে কথা
আপন হিয়ার মাঝে,
কিছু নীরবতা সুর খুঁজে পেয়ে
হৃদয়বীণায় বাজে!

মাঝে মাঝে জানি এমনো তো হয়
ভাষাহীন বেদনায়,
বোবা চোখ দিয়ে অবিরত শুধু
অশ্রু গড়িয়ে যায়!

বুকের পাঁজরে জমা হয়ে আছে
ধুলোজমা চুপকথা,
সোনার কাঠির পরশে ওরা যে
হোলো আজ রূপকথা!

কোন সে রাজার কুমারী এলে গো
ছুঁয়ে দিলে মোর হিয়া,
পরাণে পরাণ বাঁধলে যতনে
ওগো মোর প্রাণপ্রিয়া!

কোনো কথা নয়, কোনো ভাষা নয়
শুধু মায়া ভরা দৃষ্টি
হানলে এভাবে হৃদয়-মরুতে
ঝরালে সুখের বৃষ্টি!

না বলার মাঝে যে কথা বলে
তোমার মায়াবী চোখ,
সেই দৃষ্টিতে জানি লেখা আছে
প্রেমের পুণ্যশ্লোক!

–রবি লোচন দত্ত

নীরব আমি

Devjani Dutta

নাইবা হলো কথা
@@@@@@@@@

নাইবা হলো কোনো কথা
মুখে কিংবা কাগজ-কলমে,
মন জানে কি যে ব্যথা সঙ্গপনে
আছে তোর মনে মোর মনে ।।।
________:
দেবযানী দত্ত

গন্ধবণিকদের বিয়ের অনুষ্ঠান – সন্দীপ দে

Bengali wedding
Bengali wedding
A painting by Sheli Dey.

গন্ধবণিকদের বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু চর্চা।

অন্য গোত্রে বিয়ের নিয়ম:
গন্ধবণিকদের মধ্যে একই গোত্রে বিবাহের রীতি নেই। পাত্রপক্ষ ও কন্যাপক্ষের উভয়ের সন্মতিতে বিবাহের দিন স্থির হলে পান-সুপারি, মিষ্টি দ্রব্য, হলুদ সিঁদুর দিয়ে আত্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়।

অনুষ্ঠানের আরম্ভ :
দুই পক্ষের বাড়িতেই বিয়ের দিন বরণ ডালা নিয়ে এয়োরা(সধবা স্ত্রী) মা গঙ্গাকে নিমন্ত্রণ করে বিবাহের কাজ শুরু করা হয়। এবং পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে স্মরণ করে জলদান করা হয় একে নাম্নী মুখ বৃদ্দি বলা হয়। পাত্রপক্ষৈর বাড়ি থেকে হলুদ, তেল ও পাত্রীর পরিধান সামগ্রী পাঠানো হয়ে থাকে যাকে গায়েহলুদ বলে। পাত্র বরবেশে সাথে বরযাত্রীদের নিয়ে পাত্রী বাড়িতে বিবাহের জন্য উপস্থিত হলে বরণ ও মিষ্টিমুখ করে প্রবেশ করানো হয়। বৈদিক মন্ত্রে বিবাহ কার্যক্রম শুভ দৃষ্টি ও মালাবদল করে সিঁদুর দান ও হোম যজ্ঞের মাধ্যমে সকল বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয়।

বিয়ের পরের দিন :
বিবাহের পরের দিন পাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পাত্র নিজের বাড়িতে প্রবেশ করে তখন পরিবারের সাথে পরিচয়ের পাশাপাশি কিছু নিয়ম পালন করা হয়। যেমন এক কলসি জল কোমরে দেওয়া থেকে হাতে ল্যাঠা মাছ ধরানো, দুধ-আলতা জলে পা’য়ের পাতা ভিজিয়ে, বৌ’য়ের মাথায় থাকা কুনকেতে ধান যাঁতি দিয়ে বর কাটতে-কাটতে নতুন বৌ গৃহে প্রবেশ করে। এ ছাড়া কড়ি খেলা, আংটি খেলা ও মুনা-মুনি খেলা দিয়ে পরিবারের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়। বরকনে কে আর্শীবাদ দেওয়া হয়।

শেষের অনুষ্ঠান :
পরের দিন নতুন বৌ’এর ভাত-কাপড় ও পাঁচ পাতে ভাতের অনুষ্ঠান দিয়ে, দুই বাড়ির গুরুজনরা এক আসনে মিলিত হয়ে বৌ-ভাতের অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাত্রে পাত্রী পক্ষের বাড়ি থেকে আনা বিশেষ চালের গুড়োর তৈরী নাড়ু পরিবেশনের দ্বারা একে অন্যের বংশের উৎপত্তি, বৃদ্দ্বি ও গোত্রের প্রশ্নোত্তরের ছোট অনুষ্ঠান মিলনীসই বা মিলনীসভা আয়োজন করা হয়। এরপর বাড়ির পাঁচ এয়ো, চিঁড়ে, খই, ক্ষীর, মুড়কি ও পান নিয়ে শেষ পর্বে ফুলসজ্জার অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

—  সন্দীপ দে, কলকাতা

নারীর অভিলাষ – ভাগ -২

Parthasarathi Dutta
Story by Parthasarathi Dutta

শেষাংশ …(আগের ভাগ )

কনে দেখা আলোয় আলোকিত হয়েছে চরাচর। কিছু ক্ষণ আগে এতো বৃষ্টি হয়েছে কে বলবে। আকাশের বুক থেকে সরে যাচ্ছে মেঘ। সাদা মেঘ এখানে ওখানে পেঁজা পেঁজা তুলোর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রকৃতি আজ আপন মনে, আপন খেয়ালে হাসছে। বিকেলের আকাশে এক রাশ স্নিগ্ধতা। বৃষ্টি স্নাত প্রকৃতির রুপ আজ একটু অন্যরকম। ভিজে যাওয়া পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দ কানে আসছে। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী। রাধার মনের মধ্যেও তাই আজ অদ্ভুত আনন্দ। আজ তার চলার মধ্যে সে নিজেই যেন এক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। মন যেন নিজে থেকে গুন-গুনিয়ে উঠছে। তার খোলা চুলে বাতাসের মত্ততা। আজ খুব শখ করে দুই চোখে কাজল এঁকেছে। ঝাপসা হয়ে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখছে বার বার । আজ সে রতন কে চমকে দেবে। আটপৌরে শাড়ি, কপালে লাল টিপ, পায়ে আলতা আর চোখে কাজল। ব্যস। বর সোহাগী বৌ বলে আজ যেন একটু অহংকার-ই হচ্ছে তার। আজ খুব ইচ্ছে করছে, রতন এসে পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে বলুক, “তুমি সুন্দর তাই চেয়েথাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ।” হ্যাঁ। এটুকুই তো তার চাওয়া আজকের দিনে।রাধার মতো মেয়েরা বিবাহ বার্ষিকী তে দামী উপহার চাই না।কখনো চাই না নামি দামি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে। শুধু চাই তার কাছের মানুষটার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা। নিজের মনে সে যখন কল্পনার জাল বুনতে শুরু করেছে তখনই একজন হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। চিৎকার করে বলে উঠল, “দিদি রতনের এক্সিডেন্ট হয়েছে” । চলন্ত ট্রেন থেকে ছিটকে নীচে পড়ে গেছে রতন। আর তার পায়ের উপর দিয়ে পেরিয়ে গেছে লৌহ-দানব। তাকে ভর্তি করা হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে বড় কোন শহরে নিয়ে যাবে। এখানে তো এতবড় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া পুরো কথা গুলো রাধা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু তার আঘাত তাকে স্তব্ধ করে দিল। হায় রে মানুষের ভাগ্য! যখন তুমি নিজের খেয়ালে কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াচ্ছ, ভগবান তখন তার অন্তরীক্ষে থেকে হাসছে। এত সুখ এত আনন্দ এসব যে কোন গরিবদের থাকতে নেই, রাধা কি তা জানতো না? রাধা এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় । জানেনা কোথায় যাবে, কি করবে। ঠিক ভাবতে পারছে না, এখন তার কি করা উচিত।
ডাক্তার জানিয়েছেন রতনের জ্ঞান ফিরেছে। তবে তার একটা খুব বড় অপারেশন করতে হবে। দরকারে তার একটা পা হাঁটুর নীচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। কিন্তু এতো টাকা সে এখন পাবে কোথায়? কার কাছে ধার চাইবে? দুবেলা দুমুঠো ভাত কোন রকমে জোটে যে সংসারে সেখানে এতগুলো টাকা? গ্রামে যে মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু আছে, সেটাও সামান্য।তা বিক্রি করেই আর কতটুকু টাকা পাওয়া যাবে। ভাবতে ভাবতে সে পাগলীনির মত। সারা রাত রাস্তায় রাস্তায় এর ওর কাছে সাহায্য চেয়েছে। ক্লান্ত হয়ে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারে না। যখন ঘুম ভাঙে তখন সকালের আলো তার চোখে এসে লেগেছে। দেখে সে এক বাড়ির বারান্দায় শুয়ে আছে ।খিদে আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠেছে সে। রাস্তায় বেরিয়ে আসে রাধা। দেখতে পায় এত মানুষের কোলাহল, ছুটে চলা। গতিময় জীবন । গ্রাম্য জীবন থেকে অনেক আলাদা। সর্বগ্রাসী সুনামির ঢেউয়ের মত এখানে জীবন ছুটে চলেছে। আর দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটছে রাধা। এর ওর কাছে প্রার্থনা করছে যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়।
আজ দু তিন দিন এভাবেই কেটে গেল। কিন্তু খুব বেশি কিছুই ব্যবস্থা করা গেল না। এর ওর কাছে ভিক্ষে করে যা টুকু পাওয়া তা নিতান্তই সামান্য। আজ তিন দিন সে ভালো করে খায় নি, ঘুমোয় নি। দেখলে পাগলী বলেই মনে হয়। গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে আর কিছু সাহায্যের পয়সা দিয়ে আজ রতনের অপারেশন এর জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু ভগবানের মুখ পানে চেয়ে থাকা। নিস্তেজ শরীর। ক্লান্ত অবসন্ন। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা টুকু ও নেই। এতক্ষণ যেন কোন মায়া বলে ছুটে চলেছিল সে। ওটির লাল রঙের বাতিটার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠলো। হাজার বছরের ঘুম নামল তার চোখে। মাটিতেই ঘুমে লুটিয়ে পড়ল তার অবচেতন দেহ।
হাতের উপর কেউ পা দিয়ে পেরিয়ে গেল। তারই ব্যথায় উঠে পড়ল সে।হাতের ব্যথার দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ধড়ফড় করে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে গেল তার।পেটে খিদের সমুদ্র তোলপাড় করে উঠলেও, চোখের সামনে অন্ধকার। পয়সা নেই।নেই শরীরের শক্তি টুকু ও। ক্ষুধার্ত পেট কি আর সে কথা বোঝে? অথচ মনের মধ্যে তখনও তার স্বামীর চিন্তা। নার্স এসে বলল, রতনের বাড়ির কেউ আছেন? হ্যাঁ। বলে মুখ তুলে তাকালো রাধা। মুখে তার প্রগাঢ় চিন্তার স্পষ্ট ছায়া। চোখে একরাশ কৌতুহল। ওনার অপারেশন হয়ে গেছে। ওনাকে বেডে দেওয়া হয়েছে। আপনি ভেতরে আসুন। কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে ভেতরে গেল রাধা। আজ অনেক দিন পর রতন কে সে দেখল। চোখ দুটো জ্বালা করছে তার। বুকের ভেতর টা ঠুকরে কেঁদে উঠল। এই কদিনেই শরীর ভেঙে গেছে তার। ডান পা টাও কেটে বাদ দিতে হয়েছে। ডাক্তার বলে গেছেন তাকে যেন কোন মতেই উত্ত্যক্ত না করা হয়। তাই নিঃশব্দে চোখের জল মুছে রতনের পাশে এসে বসল রাধা। তার হাতের আঙ্গুল গুলো রতনের মাথার উস্কো খুস্কো চুল গুলোর ভেতর চালনা করল। রাধা জানে ভবিষ্যতে তাদের জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। বসত ভিটে টুকু ও বিক্রি করতে হয়েছে। অন্নসংস্থানের ও কোন ব্যবস্থা নেই। পথে নামা ছাড়া আর যে কোন উপায় নেই। কিন্তু এই মানুষটিকে নিয়ে কি ভাবে কাটাবে? এখান থেকে ছুটি হলে, কোথায় গিয়ে রাখবে তাকে? এসব ভাবতে ভাবতে সে রতন এর কাছ থেকে সরে গিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগলো। হাসপাতালের ঝুল জমে থাকা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠলো, হে ঈশ্বর!
আজ রতনের ছুটি হয়ে গেছে।দীর্ঘ দু মাস রোগ ভোগের পর আজ হসপিটালের চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে দুজনেই। শরীরের শক্তি প্রায় নিঃশেষ। এই দু মাস রাধা ভিক্ষে করে যা পেয়েছে তাই দুজনে মিলে খেয়েছে। যেদিন সেরকম কোন কিছুই জোটে নি সেদিন স্বামীকে খাইয়ে নিজে অভুক্ত থেকেছে। কিন্তু তার স্বামীকে জানতে পর্যন্ত দেয় নি। কোন দিন আধপেটা খেয়ে কোন দিন শুধু মাত্র জল খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে সারাদিন। এই দু মাসের অভিজ্ঞতা তার জীবনে এনেছে বার্ধক্যের ছায়া। কপালে এঁকেছে বলিরেখার চিহ্ন। হসপিটাল ছেড়ে তারা বড় রাস্তা ধরল। দশ টা এগারোটার রোদ যেন আগুন হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। জনবহুল রাস্তা যেন খাঁ খাঁ করছে। রতন খুব তৃষ্ণার্ত বোধ করছিল। একটা বাড়ির বারান্দায় রতন কে বসিয়ে রাধা ছুটল জল আনতে। এতো কিছুর পরেও স্বামীর প্রতি রাধার ভালোবাসা একটু ও কমেনি। জল ভর্তি করার পর রাস্তা পার হতে হবে, এমন সময় হঠাৎ তার মাথাটা বনবন করে ঘুরে গেল। মূহুর্তে ঝাপসা হয়ে উঠল চারপাশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটা গাড়ি ধাক্কা মারল। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রাধা। সমস্ত শরীর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। তার অন্তরাত্মা চিৎকার করে উঠলো, “ভগবান তুমি আমার মৃত্যু দিও না। আমি মরেও শান্তি পাব না। আমি কার কাছে আমার স্বামীকে রেখে নিজের মৃত্যু কামনা করব? এই জটিল পৃথিবীতে আমার রোগগ্রস্ত পঙ্গু স্বামীর আমি ছাড়া যে আর কেউই নেই। যদি একান্তই আমার প্রাণের প্রয়োজন হয় তাহলে আমার আগে আমার স্বামীর জীবন নেন প্রভু। যাতে মৃত্যুর পর আমি একটু শান্তি পেতে পারি।”রতন রাধা রাধা করে চিৎকার করে উঠলো। ততক্ষণে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। রতন ও কোন রকমে তার কাছে এগিয়ে এসেছে।রাধার রক্তে ভেজা মাথা খানি তার কোলের উপর নিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদছে। পাশের একজন বলে উঠল, ইস্!! কি মর্মান্তিক মৃত্যু!! রতন চিৎকার করে বলতে লাগল মৃত্যু নয়, মৃত্যু নয়। হতভাগী মুক্তি পেয়েছে। মুক্তি।
“কাল কেউটের ফনায় নাচছে লখিন্দর এর স্মৃতি,
বেহুলা কখনো বিধবা হয় না এটা বাংলার রীতি। ভেসে যায় ভেলা এবেলা ওবেলা একই শব দেহ নিয়ে।
আগেও মরেছি আবার মরব প্রেমের দিব্যি দিয়ে। জন্মেছি আমি আগেও অনেক মরেছি তোমারই কোলে
মুক্তি পাইনি শুধু তোমাকেই আবার দেখব বলে।”

–পার্থসারথি দত্ত