অন্তহীন – তৃতীয় পর্ব – পার্থসারথি দত্ত

পার্থসারথি দত্ত

➡ ➡ (…“অন্তহীন – ১ম পর্ব” পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন )

➡ ➡ (…“অন্তহীন – দ্বিতীয় পর্ব” পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন )

বড় গেট পেরিয়ে গাড়ি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। দুপাশে সুন্দর করে সাজানো বাগান। ফুল গাছ গুলি সুন্দর সুন্দর ফুলে ভরে আছে। আমারা যখন বাড়িতে ঢুকি কাকাবাবু তখন গাছগুলি তে জল দিচ্ছিলেন। গাছেদের পরিচর্যা ছেড়ে উনি চলে এলেন আমার কাছে। যেন কতদিনের চেনা। কত আপন সবাই। আমাদের উপরের ঘরে বসতে বলে আবার বাগানের দিকে গেলেন। আমি আর রাজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। একটা সুন্দর রবীন্দ্র সঙ্গীতের আওয়াজ ভেসে আসছে।রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে একটা আলাদা মাধুর্য আছে। যতবারই শুনি ততবার সেই মানুষটার প্রেমে পড়ে যায়। “সে চলে গেল, বলে গেল না। সে কোথায় গেল, ফিরে এলো না।” বাহ্, বেশ সুন্দর গান টা। কে চালিয়েছে রে? হঠাৎ একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম রাজার চোখে মুখে। এতক্ষণের প্রাণবন্ত উচ্ছল মানুষ টা হঠাৎ করে শামুকের মতো গুটিয়ে গেল কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম কি রে ঠিক আছিস তো? শরীর খারাপ লাগছে? না বলে প্রত্যুত্তর দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। অগত্যা আমি ও আর কথা না বাড়িয়ে ওর পিছনে পিছনে উঠতে শুরু করলাম। উপরে উঠে রাজা একজন কে দেখিয়ে বললো এ আমার বোন। আমি হতবাক হয়ে গেলাম। ওর রুমের ভেতর থেকেই আসছে গানের আওয়াজ টা। দেখে মনে হল বদ্ধ উন্মাদ। উসকো খুসকো চুল। শরীরে আলুথালু বেশ। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বাড়ির সিলিং এর দিকে। যেন এক চাতকির দৃষ্টি। আকাশের বৃষ্টির জন্য তাকিয়ে প্রতিক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সিলিং এ একটা ছোট্ট মাকড়সা তার জালের মধ্যে আপন মনে খেলা শুরু করেছে। হয়তো সেটাই দেখছে সে। চোখের কোনে কালি পড়েছে।মুখ দেখে সত্যিই খুব মায়া লাগছে।বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ। রাজা আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি চমকে উঠলাম। পরক্ষণেই পিছন ফিরে দেখি রাজার চোখ দুটো জলে ভিজে গেছে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছি না। অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছি।ভাষা পাচ্ছি না। ঠিক বুঝতে পারছি না কোথা থেকে শুরু করবো। কিই বা জিজ্ঞেস করব। ও ইশারাই ডেকে ফাঁকা ছাদের উপর গিয়ে দাঁড়ালো। আমি ও এলাম। সূর্যের শেষ আলো আস্তে আস্তে গিলে ফেলছে অন্ধকার। পশ্চিমাকাশ তখন ও আবীরে রাঙা। বিষন্নতায় ভরা সাঁঝের বাতাস। এখনও দুএকটা ঘুড়ি পতপত করে উড়ছে আকাশে। আমি নির্বাক চলচ্চিত্রের মতো দাঁড়িয়ে আছি।
কিছু বলবো ভাবছি। কিন্তু আমাকে আটকে দিয়ে ওই শুরু করলো। আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগের কথা। তখন ও মাধ্যমিক পাশ করে ইলেভেন ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনাই খুব ভালো ছিল পৃথা। আর সাথে গানের গলা ছিল অসাধারণ। এখানকার হাই স্কুলেই পড়াশোনা করত।সরস্বতী পুজোর দিন ও আর জয়ন্ত একই সঙ্গে “কোলাজ” নাটকে অভিনয় করে। ওর মুখ থেকে শুনতে শুনতে আমার চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ভেসে উঠল দিন গুলি।
মাসি- “আচ্ছা আদিত্য তোর সিরাজের অভিনয় টা মনে আছে?
আদিত্য – হ্যাঁ মাসি, মনে আছে। আচ্ছা মাসি তোমার স্টার থিয়েটারের অভিনয় টা মনে পড়ে? কি যেন, কি যেন রোলটা ছিল?
মাসি – সুভাষ বোস।
আদিত্য – হ্যাঁ। হ্যাঁ মাসি আমি সেই সুভাষ বলছি,” তোমারা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো ”
সুপ্রিয়া – আদিত্য দা?
আদিত্য – কে? গলাটা চেনা চেনা লাগছে।
সুপ্রিয়া – আমি সুপ্রিয়া
আদিত্য – এসো এসো সুপ্রিয়া
সুপ্রিয়া – এখন আমি পথের ভিখারিনী, খেতে পাইনি।
আদিত্য – শোন সুপ্রিয়া, শিল্পীর কদর এ বাংলা দিতে পারলো কৈ।
সুপ্রিয়া – অভিনয় করে সারা জীবন কাটালাম। কিন্তু জীবনের শেষ বেলায় এসে, একটু শান্তি পেলাম না। উঃ বড় কষ্ট হয়।
আদিত্য – শোন সুপ্রিয়া, ঐ দূর থেকে ভেসে আসছে গানের সুর। ”
” ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু। পথে যদি পিছিয়ে, পিছিয়ে পড়ি কভু। ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু।”

✍️✍️ চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…✍️✍️

–পার্থসারথি দত্ত

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments