নারীর অভিলাষ – ভাগ -২

Story by Parthasarathi Dutta

শেষাংশ …(আগের ভাগ )

কনে দেখা আলোয় আলোকিত হয়েছে চরাচর। কিছু ক্ষণ আগে এতো বৃষ্টি হয়েছে কে বলবে। আকাশের বুক থেকে সরে যাচ্ছে মেঘ। সাদা মেঘ এখানে ওখানে পেঁজা পেঁজা তুলোর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রকৃতি আজ আপন মনে, আপন খেয়ালে হাসছে। বিকেলের আকাশে এক রাশ স্নিগ্ধতা। বৃষ্টি স্নাত প্রকৃতির রুপ আজ একটু অন্যরকম। ভিজে যাওয়া পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দ কানে আসছে। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী। রাধার মনের মধ্যেও তাই আজ অদ্ভুত আনন্দ। আজ তার চলার মধ্যে সে নিজেই যেন এক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। মন যেন নিজে থেকে গুন-গুনিয়ে উঠছে। তার খোলা চুলে বাতাসের মত্ততা। আজ খুব শখ করে দুই চোখে কাজল এঁকেছে। ঝাপসা হয়ে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখছে বার বার । আজ সে রতন কে চমকে দেবে। আটপৌরে শাড়ি, কপালে লাল টিপ, পায়ে আলতা আর চোখে কাজল। ব্যস। বর সোহাগী বৌ বলে আজ যেন একটু অহংকার-ই হচ্ছে তার। আজ খুব ইচ্ছে করছে, রতন এসে পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে বলুক, “তুমি সুন্দর তাই চেয়েথাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ।” হ্যাঁ। এটুকুই তো তার চাওয়া আজকের দিনে।রাধার মতো মেয়েরা বিবাহ বার্ষিকী তে দামী উপহার চাই না।কখনো চাই না নামি দামি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে। শুধু চাই তার কাছের মানুষটার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা। নিজের মনে সে যখন কল্পনার জাল বুনতে শুরু করেছে তখনই একজন হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। চিৎকার করে বলে উঠল, “দিদি রতনের এক্সিডেন্ট হয়েছে” । চলন্ত ট্রেন থেকে ছিটকে নীচে পড়ে গেছে রতন। আর তার পায়ের উপর দিয়ে পেরিয়ে গেছে লৌহ-দানব। তাকে ভর্তি করা হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে বড় কোন শহরে নিয়ে যাবে। এখানে তো এতবড় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া পুরো কথা গুলো রাধা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু তার আঘাত তাকে স্তব্ধ করে দিল। হায় রে মানুষের ভাগ্য! যখন তুমি নিজের খেয়ালে কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াচ্ছ, ভগবান তখন তার অন্তরীক্ষে থেকে হাসছে। এত সুখ এত আনন্দ এসব যে কোন গরিবদের থাকতে নেই, রাধা কি তা জানতো না? রাধা এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় । জানেনা কোথায় যাবে, কি করবে। ঠিক ভাবতে পারছে না, এখন তার কি করা উচিত।
ডাক্তার জানিয়েছেন রতনের জ্ঞান ফিরেছে। তবে তার একটা খুব বড় অপারেশন করতে হবে। দরকারে তার একটা পা হাঁটুর নীচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। কিন্তু এতো টাকা সে এখন পাবে কোথায়? কার কাছে ধার চাইবে? দুবেলা দুমুঠো ভাত কোন রকমে জোটে যে সংসারে সেখানে এতগুলো টাকা? গ্রামে যে মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু আছে, সেটাও সামান্য।তা বিক্রি করেই আর কতটুকু টাকা পাওয়া যাবে। ভাবতে ভাবতে সে পাগলীনির মত। সারা রাত রাস্তায় রাস্তায় এর ওর কাছে সাহায্য চেয়েছে। ক্লান্ত হয়ে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারে না। যখন ঘুম ভাঙে তখন সকালের আলো তার চোখে এসে লেগেছে। দেখে সে এক বাড়ির বারান্দায় শুয়ে আছে ।খিদে আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠেছে সে। রাস্তায় বেরিয়ে আসে রাধা। দেখতে পায় এত মানুষের কোলাহল, ছুটে চলা। গতিময় জীবন । গ্রাম্য জীবন থেকে অনেক আলাদা। সর্বগ্রাসী সুনামির ঢেউয়ের মত এখানে জীবন ছুটে চলেছে। আর দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটছে রাধা। এর ওর কাছে প্রার্থনা করছে যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়।
আজ দু তিন দিন এভাবেই কেটে গেল। কিন্তু খুব বেশি কিছুই ব্যবস্থা করা গেল না। এর ওর কাছে ভিক্ষে করে যা টুকু পাওয়া তা নিতান্তই সামান্য। আজ তিন দিন সে ভালো করে খায় নি, ঘুমোয় নি। দেখলে পাগলী বলেই মনে হয়। গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে আর কিছু সাহায্যের পয়সা দিয়ে আজ রতনের অপারেশন এর জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু ভগবানের মুখ পানে চেয়ে থাকা। নিস্তেজ শরীর। ক্লান্ত অবসন্ন। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা টুকু ও নেই। এতক্ষণ যেন কোন মায়া বলে ছুটে চলেছিল সে। ওটির লাল রঙের বাতিটার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠলো। হাজার বছরের ঘুম নামল তার চোখে। মাটিতেই ঘুমে লুটিয়ে পড়ল তার অবচেতন দেহ।
হাতের উপর কেউ পা দিয়ে পেরিয়ে গেল। তারই ব্যথায় উঠে পড়ল সে।হাতের ব্যথার দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ধড়ফড় করে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে গেল তার।পেটে খিদের সমুদ্র তোলপাড় করে উঠলেও, চোখের সামনে অন্ধকার। পয়সা নেই।নেই শরীরের শক্তি টুকু ও। ক্ষুধার্ত পেট কি আর সে কথা বোঝে? অথচ মনের মধ্যে তখনও তার স্বামীর চিন্তা। নার্স এসে বলল, রতনের বাড়ির কেউ আছেন? হ্যাঁ। বলে মুখ তুলে তাকালো রাধা। মুখে তার প্রগাঢ় চিন্তার স্পষ্ট ছায়া। চোখে একরাশ কৌতুহল। ওনার অপারেশন হয়ে গেছে। ওনাকে বেডে দেওয়া হয়েছে। আপনি ভেতরে আসুন। কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে ভেতরে গেল রাধা। আজ অনেক দিন পর রতন কে সে দেখল। চোখ দুটো জ্বালা করছে তার। বুকের ভেতর টা ঠুকরে কেঁদে উঠল। এই কদিনেই শরীর ভেঙে গেছে তার। ডান পা টাও কেটে বাদ দিতে হয়েছে। ডাক্তার বলে গেছেন তাকে যেন কোন মতেই উত্ত্যক্ত না করা হয়। তাই নিঃশব্দে চোখের জল মুছে রতনের পাশে এসে বসল রাধা। তার হাতের আঙ্গুল গুলো রতনের মাথার উস্কো খুস্কো চুল গুলোর ভেতর চালনা করল। রাধা জানে ভবিষ্যতে তাদের জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। বসত ভিটে টুকু ও বিক্রি করতে হয়েছে। অন্নসংস্থানের ও কোন ব্যবস্থা নেই। পথে নামা ছাড়া আর যে কোন উপায় নেই। কিন্তু এই মানুষটিকে নিয়ে কি ভাবে কাটাবে? এখান থেকে ছুটি হলে, কোথায় গিয়ে রাখবে তাকে? এসব ভাবতে ভাবতে সে রতন এর কাছ থেকে সরে গিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগলো। হাসপাতালের ঝুল জমে থাকা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠলো, হে ঈশ্বর!
আজ রতনের ছুটি হয়ে গেছে।দীর্ঘ দু মাস রোগ ভোগের পর আজ হসপিটালের চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে দুজনেই। শরীরের শক্তি প্রায় নিঃশেষ। এই দু মাস রাধা ভিক্ষে করে যা পেয়েছে তাই দুজনে মিলে খেয়েছে। যেদিন সেরকম কোন কিছুই জোটে নি সেদিন স্বামীকে খাইয়ে নিজে অভুক্ত থেকেছে। কিন্তু তার স্বামীকে জানতে পর্যন্ত দেয় নি। কোন দিন আধপেটা খেয়ে কোন দিন শুধু মাত্র জল খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে সারাদিন। এই দু মাসের অভিজ্ঞতা তার জীবনে এনেছে বার্ধক্যের ছায়া। কপালে এঁকেছে বলিরেখার চিহ্ন। হসপিটাল ছেড়ে তারা বড় রাস্তা ধরল। দশ টা এগারোটার রোদ যেন আগুন হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। জনবহুল রাস্তা যেন খাঁ খাঁ করছে। রতন খুব তৃষ্ণার্ত বোধ করছিল। একটা বাড়ির বারান্দায় রতন কে বসিয়ে রাধা ছুটল জল আনতে। এতো কিছুর পরেও স্বামীর প্রতি রাধার ভালোবাসা একটু ও কমেনি। জল ভর্তি করার পর রাস্তা পার হতে হবে, এমন সময় হঠাৎ তার মাথাটা বনবন করে ঘুরে গেল। মূহুর্তে ঝাপসা হয়ে উঠল চারপাশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটা গাড়ি ধাক্কা মারল। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রাধা। সমস্ত শরীর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। তার অন্তরাত্মা চিৎকার করে উঠলো, “ভগবান তুমি আমার মৃত্যু দিও না। আমি মরেও শান্তি পাব না। আমি কার কাছে আমার স্বামীকে রেখে নিজের মৃত্যু কামনা করব? এই জটিল পৃথিবীতে আমার রোগগ্রস্ত পঙ্গু স্বামীর আমি ছাড়া যে আর কেউই নেই। যদি একান্তই আমার প্রাণের প্রয়োজন হয় তাহলে আমার আগে আমার স্বামীর জীবন নেন প্রভু। যাতে মৃত্যুর পর আমি একটু শান্তি পেতে পারি।”রতন রাধা রাধা করে চিৎকার করে উঠলো। ততক্ষণে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। রতন ও কোন রকমে তার কাছে এগিয়ে এসেছে।রাধার রক্তে ভেজা মাথা খানি তার কোলের উপর নিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদছে। পাশের একজন বলে উঠল, ইস্!! কি মর্মান্তিক মৃত্যু!! রতন চিৎকার করে বলতে লাগল মৃত্যু নয়, মৃত্যু নয়। হতভাগী মুক্তি পেয়েছে। মুক্তি।
“কাল কেউটের ফনায় নাচছে লখিন্দর এর স্মৃতি,
বেহুলা কখনো বিধবা হয় না এটা বাংলার রীতি। ভেসে যায় ভেলা এবেলা ওবেলা একই শব দেহ নিয়ে।
আগেও মরেছি আবার মরব প্রেমের দিব্যি দিয়ে। জন্মেছি আমি আগেও অনেক মরেছি তোমারই কোলে
মুক্তি পাইনি শুধু তোমাকেই আবার দেখব বলে।”

–পার্থসারথি দত্ত

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments