হাড়কাপানো হিমেল হাওয়া আর কুয়াশাচ্ছন্ন অলস সকালে ঘুম থেকে উঠে বসে আছি গরম চায়ের প্রেমময় ছোয়া ঠোঁটে আর হাতে লাগাবো বলে । এতো গাঢ় কুয়াশা শেষ কখন দেখেছি মনে নেই । অযোধ্যার এই মায়াবি জঙ্গলে পাহাড়ের উপরে রাত কাটানোর যে অনুভব তা হয়তো লিখে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই । বাকিরা বিছানায় । আমি একটু তাড়াতাড়ি উঠে গেছি । রাত্রে ঘুমের দারুন পরিবেশ থাকলেও আমার ঘুম হয়নি । সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর সবার অজান্তেই আমি ক্যামেরা আর একটা লাঠি হাতে বেরিয়ে পড়ি রাত্রের পাহাড় জঙ্গলের রোমাঞ্চ স্পর্শ করতে । সারা রাত ঘোরাঘুরি করার পর সকাল পাঁচটায় ফিরেছি । তখনও সবাই শীতের সকালের শেষ ঘুমটুকু তারিয়ে উপভোগ করছে । রাত্রে যে আমি বাইরে গেছি এটা ওরা জানে না । কি দেখলাম বলার জন্য অস্থির হচ্ছি । কিন্তু একটু অপেক্ষা করতেই হবে সবাইকে । রাত্রের সব ঘটনাটা ভাবছি, এমন সময় মঙ্গল মাঝি চা নিয়ে এলো । সে অবশ্য আমাকে ভোরে ফিরতে দেখেছে । নিজেই বলে গেল, “বাবু টুকু বইস তুই । আমি চা দিয়ে যাছি।” অযোধ্যার চায়ের বাগানের শুকনো চায়ের পাতা দিয়ে তৈরি লিকার চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তাতে চুমুক দিতে যাবো তখনই পিছন থেকে একটা আওয়াজ শুনে ঘাড় ঘোরাতে অভি বলল কত দুর গিয়েছিলি ? আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও বলল, তুই রাত্রে বাইরে গেছিলি তা আমি দেখেছি । যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল কিন্তু এত ঠান্ডায় আর বেরোতে ইচ্ছে হল না তাই আবার ঘুমিয়ে পড়লাম । বলতে বলতে একটা চেয়ার নিয়ে আমার সামনে এসে বসল, আসে পাশে তাকিয়ে কানের কাছে মুখ এনে চাপা গলায় বলল, “কি দেখলি ?”
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়ে ধীরে বললাম, কিছুই না তো । ও আরো চেপে ধরলো, তাহলে ফিরতে এত দেরি করলি কেন ? পথ হারিয়ে গেছিলাম । কই ক্যামেরাটা দেখি বলেই ও বেডরুমের দিকে ছুটল । আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পা দোলাতে লাগলাম । ক্যামেরা হাতে ছবি দেখতে দেখতে কাছে এসে অভি বলল কই, কিছুই নেই তো ! তুই পুরো রাত কি করলি বলতো ! তুই বলবি নাকি সবাইকে ডাকবো ? বলেই বেডরুমের দিকে যাবে তখনি মঙ্গল মাঝির কাঁপা গলায় ডাক এলো, “বাবু তুর চা ট লে” । অভি চা নিয়ে অশান্ত চিত্তে আমার কাছে বসল । হটাৎ মঙ্গল মাঝি বলে উঠল, “উ পাহাড়টর দিকে যাস না বাবু; লোকে অনেকে কথা বলে । মু যখন ছোট ছিলম, তখন বাপ বইলত, হাঁ পাহাড়ে বাঘ আছে । মুদের কুলির রামদাস মাঝির ছট ছিলাট হাঁ পাহাড়ে ছাগল লিয়ে গেছিল, আর ফিরে লাই । তার পর লে বহু বছর কাইটল, আর কউ হা দিকে যায় নাই । এখন উ দিকে রাইতে ফারাকে ফারাকে আগুন জ্বলতে দেখা যায় । তুদের মতন পাঁচটা কইলকাতা বাবু আসেছিল মুদের ঘরটতে । বাকি চার বাবু ঘর ঘুরে গেল । কেও ওই বাবুটর পাতা লিল নাই । মুরা কিছুদিন খুজাখুঁজি করলম । পাই লাই রে । ওই বাবুটও তুর মতন ইকাই হা দিকে রাইতে গেছিল আর ফিরল লাই । কেউ খোঁজও লিল নাই আর । ছোট মুহে বড় কুথা বুললম ।” – এই বলে মঙ্গল মাঝি চলে গেল । অভি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ওকে থামিয়ে আমি বললাম “হারিয়ে যাওয়া ছেলেটা কে জানিস ?” আরও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে । কি হচ্ছে তার কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছে না । আমি বললাম “যা তাড়াতাড়ি স্নান করে নে, একটা জায়গা ঘুরতে নিয়ে যাবো ।” ও কোনো কথা না বলে এক নিঃশ্বাসে কাপের চা খেয়ে ছুটে গেল । ভোরেই মঙ্গল মাঝি পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে স্নানের জল এনে দিয়েছে । বাকিরা তখনও কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে । ওদের ডিস্টার্ব না করে আমার ব্যাগ থেকে কিছু দরকারি জিনিস বের করছি, পিছন থেকে অভি ভেজা মাথা মুছতে মুছতে বলল আমি রেডি । মঙ্গল মাঝি দুটো থালায় খাবার নিয়ে এল সাথে আমার কথা মতো একটা টিফিনে কিছু খাবার এনে দিল । আমরা খেয়ে বেরোবার সময় মঙ্গল মাঝিকে বলে গেলাম ফিরতে দেরি হবে, ওরা উঠলে ওদের বলে দিতে । ও আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিল । বুঝলাম কিছু বলতে চাইছে । আমরা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলাম ।
Kobe pabo porer porbo,adhir agrahe thaklam
Great story! Waiting for the next episode…