
লেবার ট্রেন
—শুভ্রজিত মুদি
১ম পর্ব, সকাল ৭:০০ ; রামকানালী স্টেশন ভিড়ে ঠাসা । দুই প্ল্যাটফর্মের রামকানালীকে এখন ছোট শেয়ালদহ স্টেশন বলা যেতেই পারে । একে একে মহিলা, পুরুষ, পড়ুয়া, অফিস যাত্রীর ভীড়ে স্টেশন চত্তর আর দেখা যায় না । বার্নপুর, আসানসোল যাবে সবাই । কিছুজন কলেজ পড়ুয়া ছাড়া বেশির ভাগটাই কাজের সন্ধানে সকাল হতেই বেরিয়ে পড়েছে । তাতে পুরুষের ভাগটা বেশি হলেও মহিলারা পিছিয়ে নেই । কিছু কিছু যায়গায় জটলা বেঁধেছে । গোল করে ঘিরে বসে আছে সবাই । কেউ কেউ উচ্চশ্বরে হিসাবের পয়সাটা বুঝে নিচ্ছে । কেউ বা লোক ঠিক করছে সাথে নিয়ে যেতে । এদেরও মোটামুটি অলিখিত দলাদলি চলে । কেউ কেউ বাড়ির চাষ করা শাক-সবজি নিয়ে যাচ্ছে বিক্রি করতে । কেউ পুকুর, বন, পাহাড় থেকে রকমারি ফুল, বেলপাতা, কেঁদু পাতা, কালমেঘের চারা, অনন্তমূল, পদ্মফুল নিয়ে যাচ্ছে শহরের চাহিদা মিটিয়ে নিজের অভাবের সংসারের প্রয়োজন টুকু মেটাতে । কিছু মহিলা পুকুরের ধরা চুনো মাছ, শামুক, শালুক ডাটা নিয়ে যাচ্ছে । কিছু মানুষ কারখানায় কাজ করে । এই কর্মব্যস্ত সকালে ভীড়ের নব্বই শতাংশ মানুষ যাচ্ছে দিন মজুর আর রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে । দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সবার পেশা মোটামুটি স্থির । কিছু অদক্ষ, অনভিজ্ঞ যুবক, পৌঢ় শহর তলির বাবুদের দৈনিক প্রয়োজন মতো কাজ করে । কোনো দিন কেউ ডাকে বাগান পরিষ্কার করতে, কেউ বা ডাকে ঘর পরিষ্কার করতে, কেউ বা ডাকে পাড়ার নালি পরিষ্কার করতে । সবাই যে কাজ পায় এমনটাও নয়, অনেকে ফিরে আসে কাজ না পেয়ে । অনেকে শহরের বড়ো বড়ো ঠিকাদারদের শ্রমিক যোগান দেওয়ার কাজ করে । তাই তাদেরকে ঘিরে ষ্টেশন চত্তরে সবাই অস্থির ভাবে আজকের দিনের কাজ পাকাপাকি করতে ব্যস্ত । অনেক দুর থেকেও মানুষ আসে কাজ করতে, তবে ট্রেনটা ভর্তী থাকে মুলত জয়চন্ডীপাহাড়, বেরো আর রামকানালী ষ্টেশনের কাছাকাছি গ্রামগুলির শ্রমিক দিয়ে । অনেকে এই ট্রেনটিকে ‘লেবার’ ট্রেন বলে । ষ্টেশনের কোলাহলের মাঝেই হঠাৎ সশব্দে বেজে উঠল “বাঁকুড়া থেকে আসানসোল যাওয়ার ট্রেন ২ নং প্ল্যাটফর্মে আসছে ।” এবার দেখলাম সবাই চলাফেরা করতে শুরু করে দিল নিজনিজ অলিখিত দলে যোগ দিতে । ভিড় দেখে বোঝাই যায় না সারাদিন এই স্টেশনটি নিসঙ্গতায় ঝিমিয়ে পড়ে । একাকিত্বতা নিয়ে অপেক্ষা করে পরের সকালের, সেই ‘লেবার’ ট্রেনের । আমি বসে বসে সবটা দেখছি বেশ কিছুদিন ধরে । কারণ আমিও এখন নিত্ত যাত্রী হয়েছি । ট্রেন ঢুকতেই সবাই হুড়হুড় করে উঠে গেল অসহায় ট্রেনে । বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রোজ এই অত্যাচার সহ্য করে । ট্রেনে উঠার পর ঘাড় ঘোরানোর জায়গা থাকে না । ট্রেনটি অনেক কষ্টে সিটি বাজিয়ে এগিয়ে চলল শহরতলির দিকে । শহরতলির গলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়বে এই ভিড় । আমার সখ্যতা হয়েছে কিছু যাত্রীর সাথে । তারা সবাই রাজমিস্ত্রী, বয়সে আমার দ্বিগুন কেউ বা তিনগুন হবে । চারজনের সিটে অনায়াসে তারা নয় জন বসতে পারে । আমি উঠে ভিড় ঠেলে তাদের কাছে গিয়ে দাড়াতেই একটু পা চেপে আমাকেও বসার জায়গা করে দিল । পিঠের ব্যাগটা রেখে আমিও সানন্দে বসে পড়লাম । জানালায় তাদের টিফিন বোঝাই থলি ঝোলানো । বাড়ীতে পেটভরে খেয়ে এসেছে, সাথে খাবার নিয়েও যাচ্ছে । বাইরে পেটভরে খেতে অনেক টাকা লাগে । সারাদিনের মজুরির এক টাকাও তারা বাজে ভাবে খরচ করবে না । সিটের নিচে তাদের গাইতি, কোদাল, হাতুড়ি, রাজমিস্ত্রীদের বিভিন্ন কাজের যন্ত্রপাতি রাখা । আমার খুব ভালোলাগে এদের সাথে যেতে । প্রথম দিন চুপচাপ এদের সামনে দাড়িয়ে থেকেছি । তাদের নিঃস্বার্থ সরলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে । তাই দ্বিতীয় দিন তাড়াতাড়ি করে তাদের কাছেই গিয়ে উঠেছি । ওদের ট্রেনে জায়গা নির্দিষ্ট । সেখানে গেলেই তাদের পুরো দলটিকে পাওয়া যায় । আমি উঠেই দেখি সমহিমায় তাদের তাসের আসর জমে উঠেছে প্রতিদিনের মতোই । কয়েকজন ‘কামার’ কাকুর সাথে রোজের অভ্যাস মতো লেগে পড়েছে । সে জানালার ধারে চুপচাপ বসে ঘুমোনোর চেষ্টা করলেই মাথায় গাট্টা পড়ে । তারও ভালোই লাগে । তাই হয়তো সে সবার মনোরঞ্জনের জন্য বারবার ঢুলে পড়ে । কয়েকজন আগের দিনের কাজের কথা আলোচনা করছে । তারা শহরের বাবুদের খুব ভালোভাবে চেনে, তাদের বাড়িতে তাদের তদারকিতে কাজের মাঝে তাদের চিনে নিতে শিখে গেছে । তারা মুখ দেখেই বুঝে যায় কতো মজুরি দেবে, কেমন ব্যবহার করবে । সেই সব আলোচনা চলছে । ট্রেনে প্রচন্ড কোলাহল । হঠাৎ পাশে বসে থাকা কামার কাকুর মাথায় গাট্টা পড়তেই সবাই হাহা করে সজোরে হেসে উঠল । কামার কাকুও রোজের মতো চোখ খুলে অবাক হওয়ার মতো করে সবার মুখ গুলোর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কার কাজ । কিন্তু তা বোঝার উপায় নেই । চারজনের সিটে নয়জন বসে, সামনে আরও জনা সাত দাড়িয়ে । কিছুক্ষন সবার মুখের দিকে তাকিয়ে, শুধু ফোগলা দাঁতের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল, “সব শালারা সাট আছে” । ওটা বলতেই আবার সবাই হোহো করে হেসে উঠল, সাথে আমিও । সবাই বোধহয় এটা শোনার জন্যই অপেক্ষা করে থাকে । এদের কাছে এই ঘটনাটা রোজের হলেও ওরা এমন ভাবে উপোভোগ করে যেন আজ প্রথম । এভাবেই চলে তাদের রোজের ট্রেন যাত্রা । যেদিন কোনো একজন আসে না তারা প্রত্যেকে খবর নেয়, কেন আসে নি । কারো বাইরে যাওয়ার থাকলে আগেই জানিয়ে দেয় সে কথা । এটা ওদের ভালোবাসার প্রতিফলন তা বুঝতে আমার অসুবিধা হল না । তারা প্রত্যেকে একে অপরের পরিবারের লোকজনের কথা জানে, একে অপরের প্রয়োজনে পাশে থাকে । খবর রাখে প্রত্যেকের । কিছুদিন পর জানলাম ওরা প্রতিবছর পিকনিক করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সবাই একসাথে । এবারের পিকনিকে আমিও নেমন্তন্ন পেলাম । তবে আমার কাছে ওরা চাঁদা নেবে না, ছাত্র জীবনের ছাড় বোধহয় । আমি না গেলে আমারও ফোন করে খোজ নিয়েছে বেশ কয়েকবার । তাদের প্রতিদিনের সংঘর্ষের জীবনে এতো দায়িত্ববোধ আমাকে মুগ্ধ করেছিল । বার্ণপুর আসতেই অনেকে নেমে গেলে । বেচারা ট্রেনটি প্রানে বেঁচে গেল । অনেক #সভ্য যাত্রী এই #অসভ্য যাত্রীদের চেঁচামিচি, রসিকতা, ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধ, টিফিনে ঝোলানো রসহ্যময় খাবার দেখে অনেক অস্বস্তিবোধ করছিল । ট্রেনটা খালি হতেই তারাও হাপ ছেড়ে বাঁচল । তাদের অতৃপ্ত হৃদয়ে কিছুটা শান্তির ছোয়া । লেবার ট্রেনের প্রতিটা সিট, প্রতিটা কোনা এই ‘অসভ্য’ লেবার গুলোকে খুব কাছের থেকে চেনে । প্রান বেরিয়ে যায় যায়, তবুও রোজ তাদের প্রেমে ফিরি ফিরে আসে । আসানসোল আসতেই পুরো ট্রেন ফাকা । যে যার লক্ষে দিনের শেষে কিছু হাসি সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছড়িয়ে গেল । একটা মুল স্রোত থেকে যেন অনেক শাখা প্রশাখা বেরিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে আসানসোলের অলিতে গলিতে । আমিও নেমে হাটতে শুরু করলাম । ফেরার সময় আর দেখা হবে না এদের সাথে । আমাকে আগের ট্রেনেই ফিরতে হবে । আবার অপেক্ষা পরের দিনের । আর সবার মতো আমিও যেন অপেক্ষা করে থাকি আগামী সুর্যের । একটা অকৃত্তিম ভালোবাসা তৈরী হয়েছে এই ভিড়টার জন্য, এই অসভ্য লোকগুলোর জন্য ।
চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…
—শুভ্রজিত মুদি


খুব ভালো লাগলো পড়ে।আমারও ট্রেনে করে যাদবপুর যাওয়ার দিন গুলো মনে পড়ে গেল। ☺
রোজের ট্রেন যাত্রীদের মধ্যে অনেক স্মৃতিই থেকে যায় । অনেকে বিরক্ত হয়, অনেকে উপোভোগ করে । সবই ভালোলাগার অঙ্গ ।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। সেই জন্যই তো খুব মিস করছি সেই দিনগুলো। সত্যিই আপনার লেখা অসাধারণ
অসংখ্য ধন্যবাদ ॥
অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
ধন্যবাদ দাদা ॥