লেবার_ট্রেন – ২য় পর্ব – শুভ্রজিত মুদি

Story by শুভ্রজিত মুদি

২য় পর্ব, (…”লেবার_ট্রেন – ১ম পর্ব” এখানে পড়ুন)

লেবার_ট্রেন – ২য় পর্ – শুভ্রজিত মুদি
লেবার_ট্রেন – ২য় পর্ – শুভ্রজিত মুদি

সবার সাথে হাটতে হাটতে আমিও শহরের জনস্রোতে মিশে গেলাম । শহরটা যেন প্রান ফিরে পায় লেবার ট্রেনের লোকগুলোর জন্য । শহরের অলি গলি এদের চেনে । ছোট, বড়ো সব বাড়ির প্রতিটি ইটে এদের স্পর্শ লুকিয়ে আছে । একটা না বলা অধিকারবোধ মালিকের অজান্তে এই গরিব খেটে খাওয়া লোক গুলোকে ছুঁতে চায় । কিন্তু বাবুদের মানবিকতা তাদের চৌকাঠ ঘেসতেও দেবে না । এসব কথা ভাবতে ভাবতে আমি আমার গন্তব্যে পৌচে গেলাম । সামনেই একটা নির্মেয়মান বহুতল । অনেক উচুতে নেট লাগিয়ে কাজে ব্যস্ত কিছু শ্রমিক । রাস্তায় নামামো ইট মাথায় করে তুলছে আমার বীরাঙ্গনারা । কাজের তাড়া অনেক । ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এসে বলে গেলেন আর বেশি সময় নেই । তাড়াতাড়ি কমপ্লিট দিতে হবে কাজ । সব ফ্ল্যাটগুলো বিক্রি হয়ে গেছে, ক্লাইন্ডদের দেওয়া সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে কাজ । আজ ওভার চাইম করতে হবে কিন্তু তার জন্য কোনো বেশি টাকা তারা পাবে না কারণ তাদের কুড়েমির জন্যই কাজ পিছিয়ে আছে । বলেই গটগট করে চলে গেলেন ইঞ্জিনিয়ার । সকলেই একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে দাড়িয়ে রইল অসহায়ের মতো । তারপর আবার শুরু হল কাজ, চলতে থাকল নিজের ছন্দে । সারা দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ফাঁকিবাজের তকমাটা পেয়ে তারা যে মর্মাহত এটা তাদের আলোচনা শুনে বোঝা যাচ্ছে । একজন বলে উঠল “বাড়তি টাকা না দিলে আমি এক মিনিটও বেশি কাজ করব না, রোজ রোজ মজা পেয়েছে নাকি ?” বাকিরা সবাই চুপ করে রইল । মৌনতা সমর্থনের লক্ষন আজ তা ভালো মতে টের পেলাম । কিছুক্ষন পর আমার ছুটি হয়ে গেল, আমি আবার বেরিয়ে পড়লাম শহরের গলিতে । রাস্তায় কোথাও না কোথাও এই অসভ্য, নোংরা লোকগুলো বাবুদের আঙুলের ঈশারায় ঘাম ঝরাচ্ছে ।

হাটতে হাটতে হঠাৎ পিছন থেকে ডাক শুনে দাড়িয়ে তাকালাম, দেখি পিছনে দাড়িয়ে আমার সফর সঙ্গী লেবার ট্রেনের এক অসভ্য যাত্রী । হাতে ময়লা একটা থলি, নোংরা জামা-প্যান্ট পরা শীর্ন শরীর, কর্মঠো এক লেবার হেটে এল আমার কাছে । একবুক কষ্ট নিয়ে হাসি মুখেই বলল, “আজ কাজ পাইনি ভাইপো ।” আমি কি বলল বুঝে ওঠার আগেই ও বলল “চল একটু বাজারটা ঘুরে নিই, এখন ট্রেনের সময় আছে” । আমি কিছু না বলে পিছু পিছু হাটতে লাগলাম । শাক সবজি নিয়ে যেতে হবে ঘরের জন্য, বাড়িতে দুই ছেলে, এক মেয়ে,বউ, বুড়ো মা আছে । পুরো বাজার মোটামুটি সব দোকানেই দাম জিজ্ঞেস করে একটা কোনের দোকানে গিয়ে একটু দাগ লাগা পটল গুলোর থেকে ভালো ভালো বাছতে লাগল, বুঝলাম দাম কম । ফলের দোকানগুলো ঘুরে ফিরে কমদামি, দাগ লাগা কলা আর লেবু নিল ছোট ছেলেটার জন্য । ছোটটা যেতে যেতে পায়ে পায়ে ঘুরবে । কিছু না নিয়ে গেলে ওর মুখটার দিকে তাকানো যায় না- বলে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল অসভ্য লেবারটা । তারপর পকেটের থেকে একটা ছোট্ট পলিথিন ব্যাগের ভাঁজ খুলে তার থেকে টাকা বের করে দিল । তার অভাবের সংসারে ছেলে মেয়ে গুলোকে মানুষ করা, দু বেলা মুখে খাবার তুলে দেওয়া, বৃদ্ধা অসুস্থ মায়ের ঔষুধ এসব কিছু করার পর স্বামী স্ত্রীর ভাগ্যে আলাদা করে কিছু জুটে না । ওদের খুসি গুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে ওরাও বেশ সুখেই আছে । তাছাড়া ছেলেমেয়ে গুলোর  টিউশনের টাকা, বই খাতা চালানোর জন্য অনেক সমস্যার মুখোমুখি রোজই হতে হয় । তাদের দাম্পত্ব জীবনের ছোটবড়ো সব সুখ বিসর্জন দিয়েও তাদের সব চাহিদা মেটানো যায় না । কাল বাড়ি ফেরার পর মেয়ে জড়িয়ে ধরে বলেছে বাবা মিনতি দিদির বিয়েতে যাওয়ার আগে একটা নতুন সালোয়ার কিনে দেবে ? সেই দুর্গাপুজায় একটা নতুন জামা দিয়েছো । ওটা সব জায়গায় পরে যেতে আর ভালো লাগে না । এসব বলতে বলতে নিজের অজান্তের সেই দায়দায়িত্বহীন অসভ্য লেবারটার চোখ থেকে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে এল । কেউ টের পাওয়ার আগেই নিমেষে চোখ মুছে নিল । আমি বাকরুদ্ধ হয়ে সব শুনছি । কোনো কথা বেরোচ্ছে না । কথা বলার ভাষা হারিয়েছি । গল্পের ফাঁকে স্টেশনে পৌছে গেলাম । বসে আছি ট্রেনের অপেক্ষায় । মনে মনে ভাবছিলাম অসভ্য লেবাররটির রোজের অভাবের জীবনের সংঘর্সের কথা । সবার চাহিদা মিটিয়ে কি বা থাকে তার নিজের জন্য । রোজ সকালের লেবার ট্রেন, কয়েক বছর ধরে পরে আশা সেই নোংরা, ময়লা জামাকাপড়, ছিড়ে যাওয়া চটি জোড়া এই তার পাওয়া । তার অসুখ করে না, তার ছুটি নেই, তার বিশ্রাম নেই । আছে শুধু ক্ষুধার্ত পেট আর নিজের পরিবারের চাহিদা মেটানোর গুরু দায়িত্ব । তাই একদিন কাজ না পেলে তার ভিতর যে দাবানল জ্বলে, তার সামনে ভেষে ওঠে ছেলেমেয়ে আর বৃদ্ধা মায়ের ক্ষুদার্ত মুখ ।

জিজ্ঞেস করলাম, ” কাকু আজ কাজ পেলে না কেন ?”

– সে অনেক কথা ।

– বলো অনেকটা রাস্তা যাবো একসাথে ।

চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–শুভ্রজিত মুদি

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Harsha Chandra
Admin
7 years ago

An eyeopening series!

সজল
সজল
7 years ago

আরো গভীরে ডুব দিতে হবে, আর লেখার পরিধি বাড়াতে হবে

Sandip Dey
Sandip Dey
7 years ago

খুব সুন্দর। চলতে থাকুক…

Ranjit Halder
Ranjit Halder
7 years ago

Vlo hoye6e