লেবার ট্রেন – ১ম পর্ব – শুভ্রজিত মুদি

Subhrajit Mudi
Subhrajit Mudi

লেবার ট্রেন

—শুভ্রজিত মুদি

 ১ম পর্ব, সকাল ৭:০০ ; রামকানালী স্টেশন ভিড়ে ঠাসা । দুই প্ল্যাটফর্মের রামকানালীকে এখন ছোট শেয়ালদহ স্টেশন বলা যেতেই পারে । একে একে মহিলা, পুরুষ, পড়ুয়া, অফিস যাত্রীর ভীড়ে স্টেশন চত্তর আর দেখা যায় না । বার্নপুর, আসানসোল যাবে সবাই । কিছুজন কলেজ পড়ুয়া ছাড়া বেশির ভাগটাই কাজের সন্ধানে সকাল হতেই বেরিয়ে পড়েছে । তাতে পুরুষের ভাগটা বেশি হলেও মহিলারা পিছিয়ে নেই । কিছু কিছু যায়গায় জটলা বেঁধেছে । গোল করে ঘিরে বসে আছে সবাই । কেউ কেউ উচ্চশ্বরে হিসাবের পয়সাটা বুঝে নিচ্ছে । কেউ বা লোক ঠিক করছে সাথে নিয়ে যেতে । এদেরও মোটামুটি অলিখিত দলাদলি চলে । কেউ কেউ বাড়ির চাষ করা শাক-সবজি নিয়ে যাচ্ছে বিক্রি করতে । কেউ পুকুর, বন, পাহাড় থেকে রকমারি ফুল, বেলপাতা, কেঁদু পাতা, কালমেঘের চারা, অনন্তমূল, পদ্মফুল নিয়ে যাচ্ছে শহরের চাহিদা মিটিয়ে নিজের অভাবের সংসারের প্রয়োজন টুকু মেটাতে । কিছু মহিলা পুকুরের ধরা চুনো মাছ, শামুক, শালুক ডাটা নিয়ে যাচ্ছে । কিছু মানুষ কারখানায় কাজ করে । এই কর্মব্যস্ত সকালে ভীড়ের নব্বই শতাংশ মানুষ যাচ্ছে দিন মজুর আর রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে । দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সবার পেশা মোটামুটি স্থির । কিছু অদক্ষ, অনভিজ্ঞ যুবক, পৌঢ় শহর তলির বাবুদের দৈনিক প্রয়োজন মতো কাজ করে । কোনো দিন কেউ ডাকে বাগান পরিষ্কার করতে, কেউ বা ডাকে ঘর পরিষ্কার করতে, কেউ বা ডাকে পাড়ার নালি পরিষ্কার করতে । সবাই যে কাজ পায় এমনটাও নয়, অনেকে ফিরে আসে কাজ না পেয়ে । অনেকে শহরের বড়ো বড়ো ঠিকাদারদের শ্রমিক যোগান দেওয়ার কাজ করে । তাই তাদেরকে ঘিরে ষ্টেশন চত্তরে সবাই অস্থির ভাবে আজকের দিনের কাজ পাকাপাকি করতে ব্যস্ত । অনেক দুর থেকেও মানুষ আসে কাজ করতে, তবে ট্রেনটা ভর্তী থাকে মুলত জয়চন্ডীপাহাড়, বেরো আর রামকানালী ষ্টেশনের কাছাকাছি গ্রামগুলির শ্রমিক দিয়ে । অনেকে এই ট্রেনটিকে ‘লেবার’ ট্রেন বলে । ষ্টেশনের কোলাহলের মাঝেই হঠাৎ সশব্দে বেজে উঠল “বাঁকুড়া থেকে আসানসোল যাওয়ার ট্রেন ২ নং প্ল্যাটফর্মে আসছে ।” এবার দেখলাম সবাই চলাফেরা করতে শুরু করে দিল নিজনিজ অলিখিত দলে যোগ দিতে । ভিড় দেখে বোঝাই যায় না সারাদিন এই স্টেশনটি নিসঙ্গতায় ঝিমিয়ে পড়ে । একাকিত্বতা নিয়ে অপেক্ষা করে পরের সকালের, সেই ‘লেবার’ ট্রেনের । আমি বসে বসে সবটা দেখছি বেশ কিছুদিন ধরে । কারণ আমিও এখন নিত্ত যাত্রী হয়েছি । ট্রেন ঢুকতেই সবাই হুড়হুড় করে উঠে গেল অসহায় ট্রেনে । বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রোজ এই অত্যাচার সহ্য করে । ট্রেনে উঠার পর ঘাড় ঘোরানোর জায়গা থাকে না । ট্রেনটি অনেক কষ্টে সিটি বাজিয়ে এগিয়ে চলল শহরতলির দিকে । শহরতলির গলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়বে এই ভিড় । আমার সখ্যতা হয়েছে কিছু যাত্রীর সাথে । তারা সবাই রাজমিস্ত্রী, বয়সে আমার দ্বিগুন কেউ বা তিনগুন হবে । চারজনের সিটে অনায়াসে তারা নয় জন বসতে পারে । আমি উঠে ভিড় ঠেলে তাদের কাছে গিয়ে দাড়াতেই একটু পা চেপে আমাকেও বসার জায়গা করে দিল । পিঠের ব্যাগটা রেখে আমিও সানন্দে বসে পড়লাম । জানালায় তাদের টিফিন বোঝাই থলি ঝোলানো । বাড়ীতে পেটভরে খেয়ে এসেছে, সাথে খাবার নিয়েও যাচ্ছে । বাইরে পেটভরে খেতে অনেক টাকা লাগে । সারাদিনের মজুরির এক টাকাও তারা বাজে ভাবে খরচ করবে না । সিটের নিচে তাদের গাইতি, কোদাল, হাতুড়ি, রাজমিস্ত্রীদের বিভিন্ন কাজের যন্ত্রপাতি রাখা । আমার খুব ভালোলাগে এদের সাথে যেতে । প্রথম দিন চুপচাপ এদের সামনে দাড়িয়ে থেকেছি । তাদের নিঃস্বার্থ সরলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে । তাই দ্বিতীয় দিন তাড়াতাড়ি করে তাদের কাছেই গিয়ে উঠেছি । ওদের ট্রেনে জায়গা নির্দিষ্ট । সেখানে গেলেই তাদের পুরো দলটিকে পাওয়া যায় । আমি উঠেই দেখি সমহিমায় তাদের তাসের আসর জমে উঠেছে প্রতিদিনের মতোই । কয়েকজন ‘কামার’ কাকুর সাথে রোজের অভ্যাস মতো লেগে পড়েছে । সে জানালার ধারে চুপচাপ বসে ঘুমোনোর চেষ্টা করলেই মাথায় গাট্টা পড়ে । তারও ভালোই লাগে । তাই হয়তো সে সবার মনোরঞ্জনের জন্য বারবার ঢুলে পড়ে । কয়েকজন আগের দিনের কাজের কথা আলোচনা করছে । তারা শহরের বাবুদের খুব ভালোভাবে চেনে, তাদের বাড়িতে তাদের তদারকিতে কাজের মাঝে তাদের চিনে নিতে শিখে গেছে । তারা মুখ দেখেই বুঝে যায় কতো মজুরি দেবে, কেমন ব্যবহার করবে । সেই সব আলোচনা চলছে । ট্রেনে প্রচন্ড কোলাহল । হঠাৎ পাশে বসে থাকা কামার কাকুর মাথায় গাট্টা পড়তেই সবাই হাহা করে সজোরে হেসে উঠল । কামার কাকুও রোজের মতো চোখ খুলে অবাক হওয়ার মতো করে সবার মুখ গুলোর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কার কাজ । কিন্তু তা বোঝার উপায় নেই । চারজনের সিটে নয়জন বসে, সামনে আরও জনা সাত দাড়িয়ে । কিছুক্ষন সবার মুখের দিকে তাকিয়ে, শুধু ফোগলা দাঁতের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল, “সব শালারা সাট আছে” । ওটা বলতেই আবার সবাই হোহো করে হেসে উঠল, সাথে আমিও । সবাই বোধহয় এটা শোনার জন্যই অপেক্ষা করে থাকে । এদের কাছে এই ঘটনাটা রোজের হলেও ওরা এমন ভাবে উপোভোগ করে যেন আজ প্রথম । এভাবেই চলে তাদের রোজের ট্রেন যাত্রা । যেদিন কোনো একজন আসে না তারা প্রত্যেকে খবর নেয়, কেন আসে নি । কারো বাইরে যাওয়ার থাকলে আগেই জানিয়ে দেয় সে কথা । এটা ওদের ভালোবাসার প্রতিফলন তা বুঝতে আমার অসুবিধা হল না । তারা প্রত্যেকে একে অপরের পরিবারের লোকজনের কথা জানে, একে অপরের প্রয়োজনে পাশে থাকে । খবর রাখে প্রত্যেকের । কিছুদিন পর জানলাম ওরা প্রতিবছর পিকনিক করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সবাই একসাথে । এবারের পিকনিকে আমিও নেমন্তন্ন পেলাম । তবে আমার কাছে ওরা চাঁদা নেবে না, ছাত্র জীবনের ছাড় বোধহয় । আমি না গেলে আমারও ফোন করে খোজ নিয়েছে বেশ কয়েকবার । তাদের প্রতিদিনের সংঘর্ষের জীবনে এতো দায়িত্ববোধ আমাকে মুগ্ধ করেছিল । বার্ণপুর আসতেই অনেকে নেমে গেলে । বেচারা ট্রেনটি প্রানে বেঁচে গেল । অনেক #সভ্য যাত্রী এই #অসভ্য যাত্রীদের চেঁচামিচি, রসিকতা, ঘামে ভেজা গায়ের গন্ধ, টিফিনে ঝোলানো রসহ্যময় খাবার দেখে অনেক অস্বস্তিবোধ করছিল । ট্রেনটা খালি হতেই তারাও হাপ ছেড়ে বাঁচল । তাদের অতৃপ্ত হৃদয়ে কিছুটা শান্তির ছোয়া । লেবার ট্রেনের প্রতিটা সিট, প্রতিটা কোনা এই ‘অসভ্য’ লেবার গুলোকে খুব কাছের থেকে চেনে । প্রান বেরিয়ে যায় যায়, তবুও রোজ তাদের প্রেমে ফিরি ফিরে আসে । আসানসোল আসতেই পুরো ট্রেন ফাকা । যে যার লক্ষে দিনের শেষে কিছু হাসি সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছড়িয়ে গেল । একটা মুল স্রোত থেকে যেন অনেক শাখা প্রশাখা বেরিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে আসানসোলের অলিতে গলিতে । আমিও নেমে হাটতে শুরু করলাম । ফেরার সময় আর দেখা হবে না এদের সাথে । আমাকে আগের ট্রেনেই ফিরতে হবে । আবার অপেক্ষা পরের দিনের । আর সবার মতো আমিও যেন অপেক্ষা করে থাকি আগামী সুর্যের । একটা অকৃত্তিম ভালোবাসা তৈরী হয়েছে এই ভিড়টার জন্য, এই অসভ্য লোকগুলোর জন্য ।

চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

—শুভ্রজিত মুদি

গন্ধবণিকদের বিয়ের অনুষ্ঠান – সন্দীপ দে

Bengali wedding
Bengali wedding
A painting by Sheli Dey.

গন্ধবণিকদের বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু চর্চা।

অন্য গোত্রে বিয়ের নিয়ম:
গন্ধবণিকদের মধ্যে একই গোত্রে বিবাহের রীতি নেই। পাত্রপক্ষ ও কন্যাপক্ষের উভয়ের সন্মতিতে বিবাহের দিন স্থির হলে পান-সুপারি, মিষ্টি দ্রব্য, হলুদ সিঁদুর দিয়ে আত্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়।

অনুষ্ঠানের আরম্ভ :
দুই পক্ষের বাড়িতেই বিয়ের দিন বরণ ডালা নিয়ে এয়োরা(সধবা স্ত্রী) মা গঙ্গাকে নিমন্ত্রণ করে বিবাহের কাজ শুরু করা হয়। এবং পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে স্মরণ করে জলদান করা হয় একে নাম্নী মুখ বৃদ্দি বলা হয়। পাত্রপক্ষৈর বাড়ি থেকে হলুদ, তেল ও পাত্রীর পরিধান সামগ্রী পাঠানো হয়ে থাকে যাকে গায়েহলুদ বলে। পাত্র বরবেশে সাথে বরযাত্রীদের নিয়ে পাত্রী বাড়িতে বিবাহের জন্য উপস্থিত হলে বরণ ও মিষ্টিমুখ করে প্রবেশ করানো হয়। বৈদিক মন্ত্রে বিবাহ কার্যক্রম শুভ দৃষ্টি ও মালাবদল করে সিঁদুর দান ও হোম যজ্ঞের মাধ্যমে সকল বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয়।

বিয়ের পরের দিন :
বিবাহের পরের দিন পাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পাত্র নিজের বাড়িতে প্রবেশ করে তখন পরিবারের সাথে পরিচয়ের পাশাপাশি কিছু নিয়ম পালন করা হয়। যেমন এক কলসি জল কোমরে দেওয়া থেকে হাতে ল্যাঠা মাছ ধরানো, দুধ-আলতা জলে পা’য়ের পাতা ভিজিয়ে, বৌ’য়ের মাথায় থাকা কুনকেতে ধান যাঁতি দিয়ে বর কাটতে-কাটতে নতুন বৌ গৃহে প্রবেশ করে। এ ছাড়া কড়ি খেলা, আংটি খেলা ও মুনা-মুনি খেলা দিয়ে পরিবারের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়। বরকনে কে আর্শীবাদ দেওয়া হয়।

শেষের অনুষ্ঠান :
পরের দিন নতুন বৌ’এর ভাত-কাপড় ও পাঁচ পাতে ভাতের অনুষ্ঠান দিয়ে, দুই বাড়ির গুরুজনরা এক আসনে মিলিত হয়ে বৌ-ভাতের অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাত্রে পাত্রী পক্ষের বাড়ি থেকে আনা বিশেষ চালের গুড়োর তৈরী নাড়ু পরিবেশনের দ্বারা একে অন্যের বংশের উৎপত্তি, বৃদ্দ্বি ও গোত্রের প্রশ্নোত্তরের ছোট অনুষ্ঠান মিলনীসই বা মিলনীসভা আয়োজন করা হয়। এরপর বাড়ির পাঁচ এয়ো, চিঁড়ে, খই, ক্ষীর, মুড়কি ও পান নিয়ে শেষ পর্বে ফুলসজ্জার অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

—  সন্দীপ দে, কলকাতা

নারীর অভিলাষ – ভাগ -২

Parthasarathi Dutta
Story by Parthasarathi Dutta

শেষাংশ …(আগের ভাগ )

কনে দেখা আলোয় আলোকিত হয়েছে চরাচর। কিছু ক্ষণ আগে এতো বৃষ্টি হয়েছে কে বলবে। আকাশের বুক থেকে সরে যাচ্ছে মেঘ। সাদা মেঘ এখানে ওখানে পেঁজা পেঁজা তুলোর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রকৃতি আজ আপন মনে, আপন খেয়ালে হাসছে। বিকেলের আকাশে এক রাশ স্নিগ্ধতা। বৃষ্টি স্নাত প্রকৃতির রুপ আজ একটু অন্যরকম। ভিজে যাওয়া পাখির ডানা ঝাড়ার শব্দ কানে আসছে। আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী। রাধার মনের মধ্যেও তাই আজ অদ্ভুত আনন্দ। আজ তার চলার মধ্যে সে নিজেই যেন এক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। মন যেন নিজে থেকে গুন-গুনিয়ে উঠছে। তার খোলা চুলে বাতাসের মত্ততা। আজ খুব শখ করে দুই চোখে কাজল এঁকেছে। ঝাপসা হয়ে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখছে বার বার । আজ সে রতন কে চমকে দেবে। আটপৌরে শাড়ি, কপালে লাল টিপ, পায়ে আলতা আর চোখে কাজল। ব্যস। বর সোহাগী বৌ বলে আজ যেন একটু অহংকার-ই হচ্ছে তার। আজ খুব ইচ্ছে করছে, রতন এসে পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে বলুক, “তুমি সুন্দর তাই চেয়েথাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ।” হ্যাঁ। এটুকুই তো তার চাওয়া আজকের দিনে।রাধার মতো মেয়েরা বিবাহ বার্ষিকী তে দামী উপহার চাই না।কখনো চাই না নামি দামি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে। শুধু চাই তার কাছের মানুষটার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা। নিজের মনে সে যখন কল্পনার জাল বুনতে শুরু করেছে তখনই একজন হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল। চিৎকার করে বলে উঠল, “দিদি রতনের এক্সিডেন্ট হয়েছে” । চলন্ত ট্রেন থেকে ছিটকে নীচে পড়ে গেছে রতন। আর তার পায়ের উপর দিয়ে পেরিয়ে গেছে লৌহ-দানব। তাকে ভর্তি করা হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখান থেকে বড় কোন শহরে নিয়ে যাবে। এখানে তো এতবড় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া পুরো কথা গুলো রাধা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু তার আঘাত তাকে স্তব্ধ করে দিল। হায় রে মানুষের ভাগ্য! যখন তুমি নিজের খেয়ালে কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াচ্ছ, ভগবান তখন তার অন্তরীক্ষে থেকে হাসছে। এত সুখ এত আনন্দ এসব যে কোন গরিবদের থাকতে নেই, রাধা কি তা জানতো না? রাধা এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় । জানেনা কোথায় যাবে, কি করবে। ঠিক ভাবতে পারছে না, এখন তার কি করা উচিত।
ডাক্তার জানিয়েছেন রতনের জ্ঞান ফিরেছে। তবে তার একটা খুব বড় অপারেশন করতে হবে। দরকারে তার একটা পা হাঁটুর নীচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। কিন্তু এতো টাকা সে এখন পাবে কোথায়? কার কাছে ধার চাইবে? দুবেলা দুমুঠো ভাত কোন রকমে জোটে যে সংসারে সেখানে এতগুলো টাকা? গ্রামে যে মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু আছে, সেটাও সামান্য।তা বিক্রি করেই আর কতটুকু টাকা পাওয়া যাবে। ভাবতে ভাবতে সে পাগলীনির মত। সারা রাত রাস্তায় রাস্তায় এর ওর কাছে সাহায্য চেয়েছে। ক্লান্ত হয়ে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারে না। যখন ঘুম ভাঙে তখন সকালের আলো তার চোখে এসে লেগেছে। দেখে সে এক বাড়ির বারান্দায় শুয়ে আছে ।খিদে আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠেছে সে। রাস্তায় বেরিয়ে আসে রাধা। দেখতে পায় এত মানুষের কোলাহল, ছুটে চলা। গতিময় জীবন । গ্রাম্য জীবন থেকে অনেক আলাদা। সর্বগ্রাসী সুনামির ঢেউয়ের মত এখানে জীবন ছুটে চলেছে। আর দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটছে রাধা। এর ওর কাছে প্রার্থনা করছে যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়।
আজ দু তিন দিন এভাবেই কেটে গেল। কিন্তু খুব বেশি কিছুই ব্যবস্থা করা গেল না। এর ওর কাছে ভিক্ষে করে যা টুকু পাওয়া তা নিতান্তই সামান্য। আজ তিন দিন সে ভালো করে খায় নি, ঘুমোয় নি। দেখলে পাগলী বলেই মনে হয়। গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে আর কিছু সাহায্যের পয়সা দিয়ে আজ রতনের অপারেশন এর জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু ভগবানের মুখ পানে চেয়ে থাকা। নিস্তেজ শরীর। ক্লান্ত অবসন্ন। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা টুকু ও নেই। এতক্ষণ যেন কোন মায়া বলে ছুটে চলেছিল সে। ওটির লাল রঙের বাতিটার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠলো। হাজার বছরের ঘুম নামল তার চোখে। মাটিতেই ঘুমে লুটিয়ে পড়ল তার অবচেতন দেহ।
হাতের উপর কেউ পা দিয়ে পেরিয়ে গেল। তারই ব্যথায় উঠে পড়ল সে।হাতের ব্যথার দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ধড়ফড় করে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে গেল তার।পেটে খিদের সমুদ্র তোলপাড় করে উঠলেও, চোখের সামনে অন্ধকার। পয়সা নেই।নেই শরীরের শক্তি টুকু ও। ক্ষুধার্ত পেট কি আর সে কথা বোঝে? অথচ মনের মধ্যে তখনও তার স্বামীর চিন্তা। নার্স এসে বলল, রতনের বাড়ির কেউ আছেন? হ্যাঁ। বলে মুখ তুলে তাকালো রাধা। মুখে তার প্রগাঢ় চিন্তার স্পষ্ট ছায়া। চোখে একরাশ কৌতুহল। ওনার অপারেশন হয়ে গেছে। ওনাকে বেডে দেওয়া হয়েছে। আপনি ভেতরে আসুন। কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে ভেতরে গেল রাধা। আজ অনেক দিন পর রতন কে সে দেখল। চোখ দুটো জ্বালা করছে তার। বুকের ভেতর টা ঠুকরে কেঁদে উঠল। এই কদিনেই শরীর ভেঙে গেছে তার। ডান পা টাও কেটে বাদ দিতে হয়েছে। ডাক্তার বলে গেছেন তাকে যেন কোন মতেই উত্ত্যক্ত না করা হয়। তাই নিঃশব্দে চোখের জল মুছে রতনের পাশে এসে বসল রাধা। তার হাতের আঙ্গুল গুলো রতনের মাথার উস্কো খুস্কো চুল গুলোর ভেতর চালনা করল। রাধা জানে ভবিষ্যতে তাদের জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। বসত ভিটে টুকু ও বিক্রি করতে হয়েছে। অন্নসংস্থানের ও কোন ব্যবস্থা নেই। পথে নামা ছাড়া আর যে কোন উপায় নেই। কিন্তু এই মানুষটিকে নিয়ে কি ভাবে কাটাবে? এখান থেকে ছুটি হলে, কোথায় গিয়ে রাখবে তাকে? এসব ভাবতে ভাবতে সে রতন এর কাছ থেকে সরে গিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগলো। হাসপাতালের ঝুল জমে থাকা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠলো, হে ঈশ্বর!
আজ রতনের ছুটি হয়ে গেছে।দীর্ঘ দু মাস রোগ ভোগের পর আজ হসপিটালের চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে দুজনেই। শরীরের শক্তি প্রায় নিঃশেষ। এই দু মাস রাধা ভিক্ষে করে যা পেয়েছে তাই দুজনে মিলে খেয়েছে। যেদিন সেরকম কোন কিছুই জোটে নি সেদিন স্বামীকে খাইয়ে নিজে অভুক্ত থেকেছে। কিন্তু তার স্বামীকে জানতে পর্যন্ত দেয় নি। কোন দিন আধপেটা খেয়ে কোন দিন শুধু মাত্র জল খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে সারাদিন। এই দু মাসের অভিজ্ঞতা তার জীবনে এনেছে বার্ধক্যের ছায়া। কপালে এঁকেছে বলিরেখার চিহ্ন। হসপিটাল ছেড়ে তারা বড় রাস্তা ধরল। দশ টা এগারোটার রোদ যেন আগুন হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। জনবহুল রাস্তা যেন খাঁ খাঁ করছে। রতন খুব তৃষ্ণার্ত বোধ করছিল। একটা বাড়ির বারান্দায় রতন কে বসিয়ে রাধা ছুটল জল আনতে। এতো কিছুর পরেও স্বামীর প্রতি রাধার ভালোবাসা একটু ও কমেনি। জল ভর্তি করার পর রাস্তা পার হতে হবে, এমন সময় হঠাৎ তার মাথাটা বনবন করে ঘুরে গেল। মূহুর্তে ঝাপসা হয়ে উঠল চারপাশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটা গাড়ি ধাক্কা মারল। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রাধা। সমস্ত শরীর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। তার অন্তরাত্মা চিৎকার করে উঠলো, “ভগবান তুমি আমার মৃত্যু দিও না। আমি মরেও শান্তি পাব না। আমি কার কাছে আমার স্বামীকে রেখে নিজের মৃত্যু কামনা করব? এই জটিল পৃথিবীতে আমার রোগগ্রস্ত পঙ্গু স্বামীর আমি ছাড়া যে আর কেউই নেই। যদি একান্তই আমার প্রাণের প্রয়োজন হয় তাহলে আমার আগে আমার স্বামীর জীবন নেন প্রভু। যাতে মৃত্যুর পর আমি একটু শান্তি পেতে পারি।”রতন রাধা রাধা করে চিৎকার করে উঠলো। ততক্ষণে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। রতন ও কোন রকমে তার কাছে এগিয়ে এসেছে।রাধার রক্তে ভেজা মাথা খানি তার কোলের উপর নিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদছে। পাশের একজন বলে উঠল, ইস্!! কি মর্মান্তিক মৃত্যু!! রতন চিৎকার করে বলতে লাগল মৃত্যু নয়, মৃত্যু নয়। হতভাগী মুক্তি পেয়েছে। মুক্তি।
“কাল কেউটের ফনায় নাচছে লখিন্দর এর স্মৃতি,
বেহুলা কখনো বিধবা হয় না এটা বাংলার রীতি। ভেসে যায় ভেলা এবেলা ওবেলা একই শব দেহ নিয়ে।
আগেও মরেছি আবার মরব প্রেমের দিব্যি দিয়ে। জন্মেছি আমি আগেও অনেক মরেছি তোমারই কোলে
মুক্তি পাইনি শুধু তোমাকেই আবার দেখব বলে।”

–পার্থসারথি দত্ত

নারীর অভিলাষ – ভাগ -১

Parthasarathi Dutta
Story by Parthasarathi Dutta

আলোর শেষ রশ্মি টুকু পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিয়ে সূর্য টা তলিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমের অতলে। পাখিদের কন্ঠে তখন ঘরে ফেরার গান। কমলা রঙের আলোয় উদ্ভাসিত আকাশ। আর পাহাড়ের তখন স্নিগ্ধ আলোর স্নান। এখনই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামবে।
আলতো হাওয়া লুটিয়ে পড়ছে ঘাসের ওপর। সারাদিনের ক্লান্ত অবসন্ন শরীর সে বাতাসে নিজেকে সিক্ত করছে। মাথার ঝুঁড়ির বোঝা বাড়ির উঠোনে নামিয়ে, আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল বছর পনেরো ষোলর এক তরুনী। নাম তার ঠিক আমিও জানি না। মা’ই যখন নেই তখন কে দেবে তার নাম? কে ডাকবে নাম ধরে? গ্রামের মানুষ দশরথের মেয়ে বলেই জানে। জন্মের পর মা কে দেখেনি। তার জন্ম দিতে গিয়েই মা যে মারা গেছে। (যদিও তার বাবা তাকে জন্ম থেকেই রাধা বলে ডাকে।)
এখনও, এখানে বাড়িতেই বাচ্চা প্রসব হয়। ধাইমার মাধ্যমে সেই কাজ সম্পন্ন হয়। এখান থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। যোগাযোগের মাধ্যম বলতে পায়ে হেঁটে আর না হয় সাইকেলে চেপে। কারও অসুখ হলে খাটিয়াতে নিয়ে কাঁধে করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। সে এক দুর্যোগের রাত। মা তার প্রসব বেদনায় ছটফট করছে। শরীরের ভেতরের জলের ঘর ফেটে গেছে, কিন্তু বাচ্চা কোন ভাবেই প্রসব হয় না। ধাইমার আপ্রাণ চেষ্টা। পেট থেকে নীচের দিকে বাচ্চা কে পুশ করতে থাকে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর। আর তার চিৎকার যেন কালো মেঘের বুকে ফাটল ধরিয়ে বিদ্যুতের হাহাকার নিয়ে আসছে। তার কষ্ট, বেদনা জল হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। এভাবে কিছুক্ষন চলার পর তার কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। কিন্তু চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় মা এর জীবন ঘড়ির কাঁটা। মায়ের ভালোবাসা পাওয়া এ জন্মে তার আর হয়ে ওঠেনি। বাবার কোলে পিঠে চড়ে মানুষ হয়েছে সে। কিন্তু যে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, সেই সংসারে বাবার ভালোবাসাও বেশি দিন কপালে জোটে নি। তার বয়স যখন বারো তেরো তখনই তার বাবা পড়ল যক্ষ্মা রোগে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাই বনের কাঠ-পাতা তুলে এনে বাজারে বিক্রি করে সংসার চলত। বনের গাছ কাটা তো নিয়ম করে বন্ধ ছিলই, ভরসা ছিল কেন্দু পাতার ওপরে কিন্তু সরকার নির্দেশ জারি করে কেন্দু পাতা আর তোলা যাবে না। শুরু হয় পেটের টান। অন্ধকার ঘনায় মনের মধ্যে।প্রতিদিন সূর্যের আলো এ গ্রামে এসে পৌঁছয় ঠিকই, কিন্তু সে আলোয় অভাবের অন্ধকার দূর করতে পারে না। চৌদ্দ পনেরো বছরের বালিকার পা দুটি হতাশায় পথ খুঁজে বের করতে পারে না।মাথার উপর সংসারের বোঝা। একটা হাত ও পাই না, যে হাত তার মাথায় রেখে বলবে, ভয় কি আমি তো আছি। নিজেকেই সাহসে ভর করে উঠতে হয়। মাঠে মাঠে ঘুরে সারাদিন গোবর সংগ্রহ করে, তা দিয়ে ঘুঁটে পাকিয়ে বিক্রি করে। এভাবেই চলতে থাকে তাদের সংসার। আকাশে চাঁদ ওঠে। কিন্তু তার আলো এই হতভাগ্য পরিবারে এসে পৌঁছয় না। রাত জাগা চোখ দুটো অমাবস্যার প্রহর গোনে। চাঁদের আলো ব্রাত্য হলেও অমাবস্যার অন্ধকার রাতে তারাদের ক্ষীণ আলো জাগিয়ে রাখে বাঁচার আশা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
আজ তাকে দেখতে এসেছে। ছেলেটির নাম রতন। পাশের গ্রামের বাসিন্দা। ট্রেনে হকারের কাজ করে। ছোট বেলায় সেও মা বাবাকে হারিয়ে কখনো চায়ের দোকানে কাজ করে, কখনো হোটেলে বাসন মেজে পেট চালাত। আর এখন ট্রেনে চা বিক্রি করে। সারাদিনের উপার্জনে অন্তত খাওয়া পরার খুব একটা অসুবিধা হবে না। তার বাবা গ্রামের মানুষ দের বলে কয়ে ব্যবস্থা করেছে। তার ইচ্ছে মারা যাওয়ার আগে অন্তত মেয়েটার একটা গতি করে দিয়ে সে যেন মরতে পারে। না হলে এই মা মরা মেয়ে টার প্রতি অনেক অন্যায় করা হবে। কি জানি ভগবান ও সে পাপের ক্ষমা করবেন কি না। মেয়েটি ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। অভাবের সংসারে এই সব ঘটা করার কি খুব দরকার ছিল? তাছাড়া তার বাবা কেই বা কে দেখবে? এই তো কদিন আগে,অনেক কষ্টে আর গ্রাম দেবতার মানত করে তার বাবা ভালো হয়ে উঠেছে।দু বেলা ঠাকুরের মাদুলি ধোয়া জল খাইয়েছে । গ্রাম দেবতার পূজোর দিন সকাল থেকে উপোস করে দন্ডি কেটেছে।তার পর ঔষুধ পত্র তো আছেই। কত ডাক্তার, কবিরাজ। কত রক্ত পরীক্ষা, কফ পরীক্ষা। তবেই না তার বাবা ভালো হয়ে উঠেছে। গ্রামের লোকেরা বলেছিল পাঁঠার যকৃৎ খাওয়ালে নাকি এ রোগ খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়। অনেক কষ্ট করে পয়সা জমিয়ে সে বাবার জন্য পাঁঠার যকৃৎ নিয়ে আসত। বাবা ছাড়া এ পৃথিবীতে তার যে আর কেউ নেই। তার মা’র মৃত্যুর পর তার বাবা’ই তাকে কোলে পিঠে মানুষ করেছে। শুধু মাত্র সন্তানের সুখের জন্য সেই মানুষ টা আর বিয়ে পর্যন্ত করেনি। গ্রামের মানুষ জন কত বুঝিয়ে ছিল কিন্তু দাশু সে কথা কানে তোলেনি। দাশুর শরীর এখন ও বড় দুর্বল। উঠে দাঁড়ালে কঙ্কাল সার দেহের হাড় গুলো একটা একটা করে গোনা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না।সবুজ শিরা গুলি শরীরের উপর নানা কারুকার্য তৈরি করে রেখেছে। বাবা কিন্তু তার কথা কানে তোলে নি। আর তাই পাত্র পক্ষ আজ তাকে দেখতে এসেছে। পুরনো একখান কাপড় পরে সকল কে প্রণাম করে সে সামনে এসে বসল। লজ্জা রাঙ্গা মুখ কি যেন এক খুশিতে উন্মাদ। ঘর ভর্তি অন্ধকার। হ্যারিকেন এর ক্ষীণ আলো। নিস্তব্ধতা যেন বিরাজ করছে ঘর জুড়ে। বামুন ঠাকুর হ্যারিকেন টাকে হাতে নিয়ে একটু উপরে তুলে বলল, নাও মা একটু মুখটা তোল তো। লজ্জা ভয় মিশ্রিত একটা মুখ। কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সেই চুরি যাওয়া আলোয় , বক্র দৃষ্টিতে চোখাচোখি হল দু’জনের। আকাশের অন্ধকার ভেদ করে শুকতারার আলো এই প্রথম এসে পড়ল তার চোখে। অন্তঃসলিলা ফল্গুনদীর মত তার মনের ভেতরের সুপ্ত বাসনা গুলি ছুটে চলেছে, দ্বিগ্বিদি্ক জ্ঞান শুন্য হয়ে।
“আজ ছুটে চলে নদী সাগরের সন্ধানে,
দেখো মাতাল বাতাস আছড়ে পড়ছে
হৃদয়ের মাঝখানে।
মন বীনা আজ ঝংকারে ওঠে,
কে দিল তাহাতে টান?
পাথর চীরিয়া নামিছে বাজিয়া
ঝর্ণার কলতান ।”

আজ রাধার মন ভালো নেই। অভাবের সংসারেও তার মুখের হাসির কোন দিন খামতি ছিল না। কোন দিন কোন অভিযোগ ছিল না তার স্বামীর প্রতি। জীবনের অনেক না পাওয়া গুলো নিয়েও সে বেশ সুখীই ছিল। কিন্তু সংসারে এমন কিছু না পাওয়া আছে যার দুঃখ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এক দম্পতির জীবনে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কিছুই হয় না। এক জন নারীর কাছে মা না হওয়ার যন্ত্রণা যে কি তা একমাত্র সেই নারীই জানে। ভগবানের কাছে তার একটাই অভিযোগ, কেন এই মাতৃত্বের স্বাদ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তার জন্মের পর তার মা কে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সে কোন অভিযোগ করে নি। বিধাতার অতুল ঐশ্বর্য,জগতের সব চেয়ে মূল্যবান সম্পদই তার জন্মের পর কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তা ও তার কোন অভিযোগ নেই। অবশ্য তার বাবাও তার মায়ের অভাব টুকু কোনদিন বুঝতে দেয় নি। গ্রামের কতজন বলেছিল, দাশু তুই একটা বিয়ে করে নে। তুই ও বাঁচবি আর তোর এই মা মরা মেয়েটাও একটু স্নেহ ভালোবাসা পাবে। মেয়ে কে মানুষ করতে হবে তো? কিন্তু তার বাবা সে কথা কানেই তোলেন নি।
মাতৃ স্নেহ নাই বা দিলে, কিন্তু মাতৃত্বের স্বাদ থেকে কেন বঞ্চিত করেছো ঠাকুর? আমি তো কোন অন্যায় করিনি। কোন পাপ ও করিনি। তবে কোন জন্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে? আজ পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে এ দুঃখ নতুন নয়। কত জায়গায় মানত করেছে, কত ঠাকুরের মন্দিরে ধর্না দিয়েছে।উপোস করেছে, ঠাকুরের ফুল ধোয়া জল খেয়েছ, যগ্যির কলা খেয়েছে, কিন্তু কোন ফল হয়নি। পাড়ার লোক আড়ালে কত কথাই না বলেছে। কিন্তু রাধা তার সব কষ্ট হাসি মুখে মেনে নিয়েছে। একদিন পাশের বাড়ির এক কাকিমা তো তার মুখের উপর বলে গেল, রতন তুই বরং আর একটা বিয়ে করে ফেল। এ মাগির আর ছেলে পুলে হবে বলেতো মনে হয় না। রাধা সেদিন প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিল। কিন্তু তার স্বামী কে একটু ও বুঝতে দেয়নি। বরং সেও অভিযোগের সুরে বলেছিল,কেন
তুমি বিয়ে করতে চাও না? সত্যি তো আজ এতদিন হল, কিন্তু আমি তো তোমাকে সন্তানের মুখ দেখাতে পারলাম না। রতন হেসে বলেছিল, আচ্ছা আমি আবার বিয়ে করলে তুই সুখী হবি? কেন হব না? বারে। যখন তোমার একটা বাচ্চা হবে আমি কত আদর করব। খাইয়ে দেবো। তাকে তেল মাখাবো। ঘুম পাড়াব। রতন হেসে বলেছিল পাগলী একটা। শোন, পৃথিবীতে সব কিছু ভাগ দেওয়া যায় বুঝলি, কিন্তু স্বামীর ভালোবাসার ভাগ কাউকে দেওয়া যায় না রে। তাছাড়া আমার সমস্ত ভালোবাসা, স্বপ্ন সব তোকে ঘিরে। “নতজানু হয়ে ছিলাম তখনও, এখন যেমন আছি।মাধুকরী হও নয়ন মোহিনী স্বপ্নের কাছাকাছি।ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড কর প্রেমের পদ্যটাই। বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি শুধু তোমাকেই চাই। ” হা হা হা করে হেসে উঠেছিল রতন। আর রাধা তখন রতনের বুকে মাথা রেখে খুব কেঁদে ছিল। তার সমস্ত না পাওয়া এই স্বামীর ভালোবাসায় পাওয়া হয়ে গিয়েছিল।

চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত