প্রেমের নৌকাডুবি – শেষাংশ – পার্থসারথি দত্ত

#শেষাংশ#

অনেক খুঁজে যখন তাকে পাওয়া গেল তখন সে ডুবতে শুরু করেছে মদের নেশাই। গ্রাম থেকে বহু দূরে শশ্মানের পোড়ো বাড়িটার মধ্যে। পাশে মরা নদীতে ফুটে আছে কচুরিপানার ফুল। আকাশের বেহায়া চাঁদের নির্লজ্জ হাসিতে তারাও হাসছে। রাত তখন গভীরে ডুবে যাওয়ার প্রতিক্ষায়। বুজে যাওয়া নদীটার ক্ষীণ বহমান জল, পাথরের খাঁজে ঢুকে
মৃদু আওয়াজে নিজের অস্তিত্ব ব্যক্ত করছে। জোনাকির আলোক মালায় গাছেদের বৈভব সাজ। ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙেদের ডাক। এই সব কিছুই একটা অদ্ভুত মোহময়তা রচনা করেছে। মৃনালের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। অজিত যখন তার কাঁধে হাত রেখে বসেপড়ল তখন মৃণাল বলে উঠল, হেরে গেলাম। আমি হেরে গেলাম। অজিত, কেন হেরে যাওয়ার আগে আমার মৃত্যু হলো না? জীবনে তো আমি কখনো হারতে শিখিনি। তবে কেন আজ আমাকে এভাবে হারতে হল? জীবন ঘড়ির কাঁটা গুলো বড় ক্লান্ত অজিত। তাই এবার থেকে তারা বড় ধীর গতিতে চলবে। জীবনের সুদীর্ঘ পথ পরাজিত সৈনিকের মত মাথা নিচু করে বাঁচতে হবে। না মৃনাল না। তুই তো হেরে যাওয়ার মানুষ নোস । তোর না আর্মির চাকরি? একটা না পাওয়া জীবনের পরাজয় হতে পারে না রে। জীবনের না পাওয়া গুলো কখনো কখনো অনেক বেশি কিছু পাইয়ে দেয়। এটা বলেই পকেট থেকে একটা চিঠি বার করল অজিত। চিঠিটা অপুর লেখা।
“প্রিয় মৃণাল…
জানি না কেমন আছো? মৃত্যুর ওঁৎ পেতে থাকা রাস্তা আর প্রতিমুহূর্তে যুদ্ধের হাতছানির মাঝে আশা করি ভালোই আছো। ঘামে ভিজে যাওয়া খাঁকি পোশাকটা, অবসরের হাওয়ায় শুকোতে শুকোতে তোমার যে আমার কথা মনে পড়বে, সে তুমি না বললেও আমি ঠিক বুঝতে পারি। জ্যোৎস্নার আলোয় ভিজে যাওয়া তোমার বরফে ঢাকা কাশ্মীরের পাহাড় থেকে, মুখপুড়ি চাঁদটাকে দেখে আমার কথা নিশ্চয়ই ভাবো তা আমি জানি। কিন্তু তুমি হয়তো জানো না কত নারী মনের নিঃশব্দ মৃত্যু ঘটে প্রতিনিয়ত। ইচ্ছে অনিচ্ছের দোলায় চড়িয়ে বহুদূরে তাদের ভাসিয়ে দেওয়া হয়। রাস্তার বয়ে যাওয়া জলে কাগজের নৌকো যখন আমরা ভাসাতাম, তখন ছিল আমাদের ছেলেবেলা। কিন্তু কেবলমাত্র মেয়ে বলেই কেন ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাগজের নৌকোর মত ভাসিয়ে দেওয়া হয় আমাদের তা আমি বুঝতে পারি নি। আমার ইচ্ছে কখনো জানতে চাই নি কেউ। মা যখন বাবাকে বলেছিলেন মেয়েটার মতামত নিতে, বাবা তখন ধমক দিয়ে বলেছিলেন মেয়েদের আবার মতামত কি? যেদিন বলব, যার সঙ্গে বলব, তাকেই বিয়ে করতে হবে।ব্যস। সত্যি মৃণাল আজকের দিনেও মেয়েদের মতামতের কোন মূল্য নেই। মূল্য তো শুধু তাঁদের ফাঁকা অহংকারের। মনের ভেতর দিন দিন সযত্নে লালন পালন করা বস্তাপচা পারিবারিক ঐতিহ্যের। ছেলেটা পি এইচ ডি করেছে। অক্সফোর্ড এ কর্মরত। কিন্তু বিশ্বাস কর মৃণাল আমি এসব কিছুই চাই নি।শুধু চেয়েছিলাম তোমার সঙ্গে সুখের ঘর বাঁধতে। সমুদ্রের তীরে একটু একটু করে যে খেলা ঘর আমি বাঁধতে শুরু করেছিলাম, হঠাৎ একটা ঢেউ এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সবচেয়ে দুঃখ কি জানো মৃণাল? আমি যখন তোমার কথা বললাম, তখন আমার ফোনটাও আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল। আমার কলেজ বন্ধ করে দিল। কত বিনিদ্র রাত আমি তোমার কথা ভেবে কাটিয়েছি। জানি না কিসের টান যা বারবার আমাকে তোমার কাছে টেনে নিয়ে যায়। বহু পথ ঘুরে হারাতে চাওয়া মন তোমার সীমানায় এসে পথ হারায়। আমার অবাধ্য পালক গুলো বারবার ডানা ঝাপটে তোমার কাছে যেতে চাই, একটু যত্ন পাওয়ার আশায় ।তোমাকে না পাওয়ার যন্ত্রণা টা, আমার আমি টাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।আমি কোনদিন সুন্দরী ছিলাম কি না জানি না। তবে ছেলের বাড়ি আমার মধ্যে সৌন্দর্য্য টাই দেখেছে। আমার সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা মনের খবর নেই নি ওরা। আজ আমার আর দামী আসবাবের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ওরা আমাকে বৌ করে নিয়ে যাচ্ছে না মৃণাল। ওরা আমার সৌন্দর্য টা বাড়ি সাজাতে ব্যবহার করবে। ওদের সৌখিন অট্টালিকায় আমি কেবল ঘর সাজানোর ফুলদানি। এখন মনে হয়, সুন্দরী হয়ে না জন্মালেই হয়তো ভালো হতো। তুমি কিছু মনে করো না মৃণাল। ভেবোনা ফাঁকি দিয়েছি তোমায়। হৃদয়ের অন্তরতম অন্তস্থলে চীর সবুজ হয়ে তুমি ছিলে, আছো, থাকবে। তোমায় শব্দ দিয়ে নাই বা সাজালাম। গহীন মনের রাজপ্রাসাদে তুমিই রাজা।রাজ মুকুট শুধু তোমারই জন্য। তোমার সেই কবিতাটা খেয়াল আছে মৃণাল? পূর্ণেন্দু পাত্রীর ” সেই গল্প টা ”
“ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরম নদী
পুরুষেরা জ্বলন্ত কাঠ।
সেইভাবেই মেঘ ছিল পাহাড়ের আলিঙ্গনের আগুনে
পাহাড় ছিলো মেঘের ঢেউ-জলে।
হঠাৎ,
আকাশ জুড়ে বেজে উঠলো ঝড়ের জগঝম্প
ঝাঁকড়া চুল উড়িয়ে ছিনতাই এর ভঙ্গিতে ছুটে এল
এক ঝাঁক হাওয়া
মেঘের আঁচলে টান মেরে বললে
-ওঠ্ ছুঁড়ি! তোর বিয়ে।

এখনো শেষ হয়নি গল্পটা।
বজ্রের সঙ্গে মেঘের বিয়েটা হয়ে গেলো ঠিকই
কিন্তু পাহাড়কে সে কোনোদিন ভুলতে পারলনা।
বিশ্বাস না হয় তো চিরে দেখতে পারো
পাহাড়টার হাড়-পাঁজর,
ভিতরে থৈথৈ করছে
শত ঝর্ণার জল।”
ভালো থেকো মৃণাল। খুব ভালো থেকো। ”
ইতি তোমার
অপরাজিতা।

এমনি করেই কাটছিল মৃনালের দিন। হঠাৎ মিলিটারি বসের ফোন। খুব তাড়াতাড়ি ডিউটি তে যোগ দিতে হবে তাকে। গোপন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে, কিছু পাক চর (আতঙ্কবাদী) ঢুকে পড়েছে সীমান্তে। কাশ্মীরের জঙ্গলে তারা লুকিয়ে আছে। যে কোন মুহূর্তে শুরু হতে পারে গুলির বিনিময়। আর তাই তাদের তাড়াতাড়ির মধ্যে যোগদিতে হবে।
প্যারেড গ্রাউন্ডে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, কে কোন পজিশনে থাকবে।
হ্যালিকাপ্টারে করেও নজরদারি চালানো হচ্ছে। শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে সকলের হাতে। একটা একটা করে গাড়ি বেরিয়ে পড়ছে আর্মি ক্যাম্প এর ভেতর থেকে।
মৃণালের গাড়ির কাছে এসে দেখা করল তার মিলিটারি বস। মৃনাল কে সে একটু বেশি ভালোবাসে। অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং এ সেই ছিল সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র। তাদের সুটিং কম্পিডিশনে সেই ছিল প্রথম। আজ মৃনালের পিঠ চাপড়ে বলে উঠলো, তোমার ওপর আমার অনেক প্রত্যাশা। আমি জানি তুমি বীর যোদ্ধা। তুমি জয়ী হয়েই ফিরবে। তোমার ললাটে জয়ের তিলক এঁকে দিতে আমি অপেক্ষা করবো। মুহূর্তে শক্ত হয়ে ওঠে মৃনালের চোয়াল। গর্বে ফুলে ওঠে তার বুক। চোখে তার জয়ের নেশা। মুখে প্রশস্ত হাসি। কোন পিছু টান নেই। দেশ বাঁচাতে বদ্ধপরিকর এক বীর যোদ্ধা।
হঠাৎ কিছু একটা আওয়াজে চমকে উঠল সবাই। গাড়ি থেকে নেমে যে যার মতো পজিশন নিয়ে নিয়েছে। কেউ পাহাড়ের কোলে, কেউ গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে শুরু হলো দু’পক্ষের গুলির লড়াই। ভারত মাতা কি? জয়। ধ্বনি দিতে দিতে চলছে শত্রু নিধন যগ্ঞ। মাঝে মাঝে দু একটা বোমার আওয়াজে কেঁপে উঠছে কাশ্মীরের মাটি। আকাশে বাতাসে ভেসে যাচ্ছে বারুদ এর গন্ধ। এভাবে অনেক ক্ষন চলতে থাকে। মৃনালের নিপুণ লক্ষ্যে ব্যহত হয় পাক বাহিনীর চক্রান্ত। তার পর এক সময় শান্ত হয় বিপক্ষের প্রতিঘাত। আবারও ভারত মাতা কি? জয়, ধ্বনিতে চলে যুদ্ধ জয়ের উল্লাস। এবার শুধু লাশ গুলো উদ্ধার করার পালা। মৃনাল এগিয়ে আসছে, হঠাৎ ছুটে আসে একটা বুলেট। মৃনালের বুকের মাঝ বরাবর গেঁথে গেছে। মুহূর্তে লুটিয়ে পড়ে মৃনাল। আবার গুলি চালাতে শুরু করে ভারতীয় সেনা। ওরা যে দু এক জন বেঁচে ছিল তারা পিছনে পালিয়ে যাচ্ছে । মৃনাল যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এক মূহুর্ত দেরী না করে সকলেই ছুটে আসে, তার মিলিটারি বস ও ততক্ষণে ছুটে এসেছেন তার কাছে। মৃনাল তোমার কিচ্ছু হয় নি। কিচ্ছু হয় নি তোমার। তোমাকে বাঁচতে হবে। না স্যার। আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। আপনি শুধু কথা দিন আপনি ওদের শেষ করবেন, ওদের চক্রান্ত বানচাল করে যুদ্ধ জয়ের শেষ হাসি টা আপনিই হাসবেন স্যার। কথাদিন। কথাদিন। আমি তো আর দেখে যেতে পারলাম না স্যার। কিন্তু আপনি ওদের শেষ করে আমার মৃত আত্মার শান্তি কামনা করবেন। আমার মৃতদেহ টা কে গান স্যালুট দিয়ে সন্মান জানানোর আগে, আমার লাশের পাশে ওদের লাশ গুলো শুয়িয়ে রাখবেন। আর তা না হলে আমি মরেও শান্তি পাবনা স্যার। বলুন না স্যার, বলুন না। আর তা যদি না হয়, বলতে বলতে গলার স্বর বুজে এলো তার। চোখের পাতা গুলোও জড়িয়ে যাচ্ছে । হাঁপিয়ে উঠছে সে। বিন্দু বিন্দু ঘামে ভিজে গেছে তার মুখমণ্ডল। সেই একই কথা যেন পুনরাবৃত্তি ঘটল তার বসের মুখ থেকে, “তা যদি না হয়? ” মৃত্যু পথযাত্রি মানুষ টা হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে উঠল,
“তা যদি না হয় জানবো তুমি তো মানুষ নও,
গোপনে গোপনে দেশদ্রোহীর পতাকা বও।
ভারতবর্ষ মাটি দেয় নি কো? দেয় নি জল?
দেয়নি তোমার মুখেতে অন্ন? বুকেতে বল?
পূর্ব পুরুষ অনুপস্থিত রক্তে তাই,
ভারতবর্ষে আজকে তোমার নেইকো ঠাঁই।”

–পার্থসারথি দত্ত

2
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
1 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
2 Comment authors
Parthasarathi DuttaHiya Chandra Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Hiya Chandra
Member
Hiya Chandra

গল্পটা খুবই সুন্দর লিখেছেন দাদা। “শেষ হয়েও হইলো না শেষ”দারুণ হয়েছে