নারীর অভিলাষ – ভাগ -১

Story by Parthasarathi Dutta

আলোর শেষ রশ্মি টুকু পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিয়ে সূর্য টা তলিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমের অতলে। পাখিদের কন্ঠে তখন ঘরে ফেরার গান। কমলা রঙের আলোয় উদ্ভাসিত আকাশ। আর পাহাড়ের তখন স্নিগ্ধ আলোর স্নান। এখনই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামবে।
আলতো হাওয়া লুটিয়ে পড়ছে ঘাসের ওপর। সারাদিনের ক্লান্ত অবসন্ন শরীর সে বাতাসে নিজেকে সিক্ত করছে। মাথার ঝুঁড়ির বোঝা বাড়ির উঠোনে নামিয়ে, আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল বছর পনেরো ষোলর এক তরুনী। নাম তার ঠিক আমিও জানি না। মা’ই যখন নেই তখন কে দেবে তার নাম? কে ডাকবে নাম ধরে? গ্রামের মানুষ দশরথের মেয়ে বলেই জানে। জন্মের পর মা কে দেখেনি। তার জন্ম দিতে গিয়েই মা যে মারা গেছে। (যদিও তার বাবা তাকে জন্ম থেকেই রাধা বলে ডাকে।)
এখনও, এখানে বাড়িতেই বাচ্চা প্রসব হয়। ধাইমার মাধ্যমে সেই কাজ সম্পন্ন হয়। এখান থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। যোগাযোগের মাধ্যম বলতে পায়ে হেঁটে আর না হয় সাইকেলে চেপে। কারও অসুখ হলে খাটিয়াতে নিয়ে কাঁধে করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। সে এক দুর্যোগের রাত। মা তার প্রসব বেদনায় ছটফট করছে। শরীরের ভেতরের জলের ঘর ফেটে গেছে, কিন্তু বাচ্চা কোন ভাবেই প্রসব হয় না। ধাইমার আপ্রাণ চেষ্টা। পেট থেকে নীচের দিকে বাচ্চা কে পুশ করতে থাকে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর। আর তার চিৎকার যেন কালো মেঘের বুকে ফাটল ধরিয়ে বিদ্যুতের হাহাকার নিয়ে আসছে। তার কষ্ট, বেদনা জল হয়ে ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। এভাবে কিছুক্ষন চলার পর তার কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। কিন্তু চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় মা এর জীবন ঘড়ির কাঁটা। মায়ের ভালোবাসা পাওয়া এ জন্মে তার আর হয়ে ওঠেনি। বাবার কোলে পিঠে চড়ে মানুষ হয়েছে সে। কিন্তু যে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, সেই সংসারে বাবার ভালোবাসাও বেশি দিন কপালে জোটে নি। তার বয়স যখন বারো তেরো তখনই তার বাবা পড়ল যক্ষ্মা রোগে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাই বনের কাঠ-পাতা তুলে এনে বাজারে বিক্রি করে সংসার চলত। বনের গাছ কাটা তো নিয়ম করে বন্ধ ছিলই, ভরসা ছিল কেন্দু পাতার ওপরে কিন্তু সরকার নির্দেশ জারি করে কেন্দু পাতা আর তোলা যাবে না। শুরু হয় পেটের টান। অন্ধকার ঘনায় মনের মধ্যে।প্রতিদিন সূর্যের আলো এ গ্রামে এসে পৌঁছয় ঠিকই, কিন্তু সে আলোয় অভাবের অন্ধকার দূর করতে পারে না। চৌদ্দ পনেরো বছরের বালিকার পা দুটি হতাশায় পথ খুঁজে বের করতে পারে না।মাথার উপর সংসারের বোঝা। একটা হাত ও পাই না, যে হাত তার মাথায় রেখে বলবে, ভয় কি আমি তো আছি। নিজেকেই সাহসে ভর করে উঠতে হয়। মাঠে মাঠে ঘুরে সারাদিন গোবর সংগ্রহ করে, তা দিয়ে ঘুঁটে পাকিয়ে বিক্রি করে। এভাবেই চলতে থাকে তাদের সংসার। আকাশে চাঁদ ওঠে। কিন্তু তার আলো এই হতভাগ্য পরিবারে এসে পৌঁছয় না। রাত জাগা চোখ দুটো অমাবস্যার প্রহর গোনে। চাঁদের আলো ব্রাত্য হলেও অমাবস্যার অন্ধকার রাতে তারাদের ক্ষীণ আলো জাগিয়ে রাখে বাঁচার আশা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
আজ তাকে দেখতে এসেছে। ছেলেটির নাম রতন। পাশের গ্রামের বাসিন্দা। ট্রেনে হকারের কাজ করে। ছোট বেলায় সেও মা বাবাকে হারিয়ে কখনো চায়ের দোকানে কাজ করে, কখনো হোটেলে বাসন মেজে পেট চালাত। আর এখন ট্রেনে চা বিক্রি করে। সারাদিনের উপার্জনে অন্তত খাওয়া পরার খুব একটা অসুবিধা হবে না। তার বাবা গ্রামের মানুষ দের বলে কয়ে ব্যবস্থা করেছে। তার ইচ্ছে মারা যাওয়ার আগে অন্তত মেয়েটার একটা গতি করে দিয়ে সে যেন মরতে পারে। না হলে এই মা মরা মেয়ে টার প্রতি অনেক অন্যায় করা হবে। কি জানি ভগবান ও সে পাপের ক্ষমা করবেন কি না। মেয়েটি ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। অভাবের সংসারে এই সব ঘটা করার কি খুব দরকার ছিল? তাছাড়া তার বাবা কেই বা কে দেখবে? এই তো কদিন আগে,অনেক কষ্টে আর গ্রাম দেবতার মানত করে তার বাবা ভালো হয়ে উঠেছে।দু বেলা ঠাকুরের মাদুলি ধোয়া জল খাইয়েছে । গ্রাম দেবতার পূজোর দিন সকাল থেকে উপোস করে দন্ডি কেটেছে।তার পর ঔষুধ পত্র তো আছেই। কত ডাক্তার, কবিরাজ। কত রক্ত পরীক্ষা, কফ পরীক্ষা। তবেই না তার বাবা ভালো হয়ে উঠেছে। গ্রামের লোকেরা বলেছিল পাঁঠার যকৃৎ খাওয়ালে নাকি এ রোগ খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়। অনেক কষ্ট করে পয়সা জমিয়ে সে বাবার জন্য পাঁঠার যকৃৎ নিয়ে আসত। বাবা ছাড়া এ পৃথিবীতে তার যে আর কেউ নেই। তার মা’র মৃত্যুর পর তার বাবা’ই তাকে কোলে পিঠে মানুষ করেছে। শুধু মাত্র সন্তানের সুখের জন্য সেই মানুষ টা আর বিয়ে পর্যন্ত করেনি। গ্রামের মানুষ জন কত বুঝিয়ে ছিল কিন্তু দাশু সে কথা কানে তোলেনি। দাশুর শরীর এখন ও বড় দুর্বল। উঠে দাঁড়ালে কঙ্কাল সার দেহের হাড় গুলো একটা একটা করে গোনা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না।সবুজ শিরা গুলি শরীরের উপর নানা কারুকার্য তৈরি করে রেখেছে। বাবা কিন্তু তার কথা কানে তোলে নি। আর তাই পাত্র পক্ষ আজ তাকে দেখতে এসেছে। পুরনো একখান কাপড় পরে সকল কে প্রণাম করে সে সামনে এসে বসল। লজ্জা রাঙ্গা মুখ কি যেন এক খুশিতে উন্মাদ। ঘর ভর্তি অন্ধকার। হ্যারিকেন এর ক্ষীণ আলো। নিস্তব্ধতা যেন বিরাজ করছে ঘর জুড়ে। বামুন ঠাকুর হ্যারিকেন টাকে হাতে নিয়ে একটু উপরে তুলে বলল, নাও মা একটু মুখটা তোল তো। লজ্জা ভয় মিশ্রিত একটা মুখ। কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সেই চুরি যাওয়া আলোয় , বক্র দৃষ্টিতে চোখাচোখি হল দু’জনের। আকাশের অন্ধকার ভেদ করে শুকতারার আলো এই প্রথম এসে পড়ল তার চোখে। অন্তঃসলিলা ফল্গুনদীর মত তার মনের ভেতরের সুপ্ত বাসনা গুলি ছুটে চলেছে, দ্বিগ্বিদি্ক জ্ঞান শুন্য হয়ে।
“আজ ছুটে চলে নদী সাগরের সন্ধানে,
দেখো মাতাল বাতাস আছড়ে পড়ছে
হৃদয়ের মাঝখানে।
মন বীনা আজ ঝংকারে ওঠে,
কে দিল তাহাতে টান?
পাথর চীরিয়া নামিছে বাজিয়া
ঝর্ণার কলতান ।”

আজ রাধার মন ভালো নেই। অভাবের সংসারেও তার মুখের হাসির কোন দিন খামতি ছিল না। কোন দিন কোন অভিযোগ ছিল না তার স্বামীর প্রতি। জীবনের অনেক না পাওয়া গুলো নিয়েও সে বেশ সুখীই ছিল। কিন্তু সংসারে এমন কিছু না পাওয়া আছে যার দুঃখ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এক দম্পতির জীবনে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কিছুই হয় না। এক জন নারীর কাছে মা না হওয়ার যন্ত্রণা যে কি তা একমাত্র সেই নারীই জানে। ভগবানের কাছে তার একটাই অভিযোগ, কেন এই মাতৃত্বের স্বাদ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তার জন্মের পর তার মা কে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সে কোন অভিযোগ করে নি। বিধাতার অতুল ঐশ্বর্য,জগতের সব চেয়ে মূল্যবান সম্পদই তার জন্মের পর কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তা ও তার কোন অভিযোগ নেই। অবশ্য তার বাবাও তার মায়ের অভাব টুকু কোনদিন বুঝতে দেয় নি। গ্রামের কতজন বলেছিল, দাশু তুই একটা বিয়ে করে নে। তুই ও বাঁচবি আর তোর এই মা মরা মেয়েটাও একটু স্নেহ ভালোবাসা পাবে। মেয়ে কে মানুষ করতে হবে তো? কিন্তু তার বাবা সে কথা কানেই তোলেন নি।
মাতৃ স্নেহ নাই বা দিলে, কিন্তু মাতৃত্বের স্বাদ থেকে কেন বঞ্চিত করেছো ঠাকুর? আমি তো কোন অন্যায় করিনি। কোন পাপ ও করিনি। তবে কোন জন্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে? আজ পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে এ দুঃখ নতুন নয়। কত জায়গায় মানত করেছে, কত ঠাকুরের মন্দিরে ধর্না দিয়েছে।উপোস করেছে, ঠাকুরের ফুল ধোয়া জল খেয়েছ, যগ্যির কলা খেয়েছে, কিন্তু কোন ফল হয়নি। পাড়ার লোক আড়ালে কত কথাই না বলেছে। কিন্তু রাধা তার সব কষ্ট হাসি মুখে মেনে নিয়েছে। একদিন পাশের বাড়ির এক কাকিমা তো তার মুখের উপর বলে গেল, রতন তুই বরং আর একটা বিয়ে করে ফেল। এ মাগির আর ছেলে পুলে হবে বলেতো মনে হয় না। রাধা সেদিন প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিল। কিন্তু তার স্বামী কে একটু ও বুঝতে দেয়নি। বরং সেও অভিযোগের সুরে বলেছিল,কেন
তুমি বিয়ে করতে চাও না? সত্যি তো আজ এতদিন হল, কিন্তু আমি তো তোমাকে সন্তানের মুখ দেখাতে পারলাম না। রতন হেসে বলেছিল, আচ্ছা আমি আবার বিয়ে করলে তুই সুখী হবি? কেন হব না? বারে। যখন তোমার একটা বাচ্চা হবে আমি কত আদর করব। খাইয়ে দেবো। তাকে তেল মাখাবো। ঘুম পাড়াব। রতন হেসে বলেছিল পাগলী একটা। শোন, পৃথিবীতে সব কিছু ভাগ দেওয়া যায় বুঝলি, কিন্তু স্বামীর ভালোবাসার ভাগ কাউকে দেওয়া যায় না রে। তাছাড়া আমার সমস্ত ভালোবাসা, স্বপ্ন সব তোকে ঘিরে। “নতজানু হয়ে ছিলাম তখনও, এখন যেমন আছি।মাধুকরী হও নয়ন মোহিনী স্বপ্নের কাছাকাছি।ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড কর প্রেমের পদ্যটাই। বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি শুধু তোমাকেই চাই। ” হা হা হা করে হেসে উঠেছিল রতন। আর রাধা তখন রতনের বুকে মাথা রেখে খুব কেঁদে ছিল। তার সমস্ত না পাওয়া এই স্বামীর ভালোবাসায় পাওয়া হয়ে গিয়েছিল।

চলবে…. ক্রমশঃ প্রকাশ্যমান…

–পার্থসারথি দত্ত

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of