রহস্যময়ী অযোধ্যা – ২য় পর্ব – শুভ্রজিত মুদি

Subhrajit Mudi
শুভ্রজিত মুদি

➡ ➡ …”রহস্যময়ী অযোধ্যা – ১ম পর্ব” এখানে পড়ুন

রহশ্যময়ী অযোধ্যা
রহশ্যময়ী অযোধ্যা

রাস্তায় না হেটে আমি আর অভি পাহাড়ি ঢালু পথে শর্টকার্ট নিয়ে চললাম । অভি খুব ভয়ে ভয়ে পিছুপিছু হাঁটছে । শাল গাছের ঘন জঙ্গলের মাঝে পাহাড়ি হাটা পথ, মাঝে মাঝে কাঁটা গাছ, কেদু পাতার গাছ, কত নাম না জানা লতা । এসবের মাঝে আমি আর অভি এগিয়ে যাচ্ছি । ওর পিঠে একটা ব্যাগে টিফিন আর জল। আমার ব্যাগে কিছু দরকারি জিনিস যেমন আতস কাচ, দুরবিন, ছুরি, দড়ি, ব্ল্যাক টেপ, টর্চ, গ্যাস লাইটার ইত্যাদি । কিছুটা পথ চলার পর অভির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও এখনও চিন্তামগ্ন । ওকে হালকা করার জন্য আমি ‘লালপাহাড়ির দেশে যা’ গানটা গুনগুন করে গাইতে লাগলাম, যদিও বলে রাখা ভালো আমি খুব খারাপ গান করি । আমার বেসুরো গলা শুনে অভির গলার ভেসে এলো ‘লাল পাহাড়ির দেশ’ । আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলাম । সকালে শাল বনের গাছের ফাঁকে রোদ ঠিকরে পড়ছে । শিশির ভেজা পাতাগুলো সোনালি রোদের আভায় আরও চকচক করছে । মাঝে মাঝে একটা দুটো বন মোরোগ দেখতে পাচ্ছি । আমরা হেটে চলেছি উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ দিয়ে ।

এবার অভি একটা দ্বীর্ঘশ্বাস নিয়ে  একটু স্পষ্টভাবে বলল ‘কোথায় যাচ্ছি আমরা ?’

আমি হেসে বললাম ভয় পাচ্ছে ? ভয় না, বাকিদের নিয়ে এলে ভালো হতো না ? এভাবে একা একা ! কিছু যদি হয়ে যায় ?

আমি কিছু জবাব না দিয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম ।

কি এমন করতে যাচ্ছিস বলতো ! সবাই মিলে এলেই তো পারতিস ।

এসব কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছি সেই নিষিদ্ধ, দুর্গম পাহাড়ের দিকে । জঙ্গল ক্রমেই ঘন, আরও ঘন হয়ে যাচ্ছে । মঙ্গল মাঝি তো বলেইছিল এদিকে লোকজন আসে না । না আসারই কথা । জঙ্গল এতই ঘন যে দিনের আলোতেও গা ছমছম করছে । শীতের সকালেও  ঘাম দিচ্ছে । এবার দ্রুত হাটা যাচ্ছে না । লতাপাতা কেটে একটু একটু করে এগোচ্ছি । যে করেই হোক পৌঁছাতেই হবে কালকের সেই জায়গায় । কাল দুর থেকে যা  দেখেছিলাম সেগুলো কি জানতে হবেই আমাকে । এসব ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলেছি হঠাৎ দুরের ঝোপটা নড়ে উঠলো । ভয়ে আমি আর অভি দুজনেই একটা শাল গাছের আড়ালে লুকিয়ে বসে পড়েছি । কিছুক্ষন সব স্থির । ভয়ে বুক দুরুদুরু করছে । আমি ধীরে ব্যাগ থেকে ছুরিটা বের করে শক্ত হাতে ধরলাম । অভি আরও ভয় পেয়ে গেছে আমাকে ছুরি বের করতে দেখে ।

কাপাকাপা গলায় বলল কি আছে ঝোপে ? তুই কি করতে এসেছিস ? কেই বা হারিয়ে গিয়েছিল এই জঙ্গলে ?

আমি ধীরে চাপা গলায় বললাম সব উত্তর পাবি কিন্তু এটা কি প্রশ্ন করার সময় ! আমি কি করে জানব ঝোপে কি আছে ! কিছুক্ষন সব চুপচাপ ।

অভি বলল একটা পাথর ছুড়ে দেখ না ।

আমি ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে এগিয়ে যাচ্ছি ঝোপের দিকে । অভি হাতের লাঠিটা শক্ত করে ধরে আমার পিছুপিছু আসছে ।

কই কিছুই নেই তো ! তাহলে ঝোপটা এত জোরে নড়ে উঠলো কেন ? কে ছিল এখানে ? কোথায় বা গেল ? অদৃশ্য হয়ে গেল নাকি ! আমরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম । ভয়ে ভয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখছি । ঠিক তখনই অভি অস্থির ভাবে বলল, ‘আমার সব প্রশ্নের উত্তর চাই, নাহলে আমি আর এক পা এগোব না ।’ আমি কিছু না বলে ছুরিটা ব্যাগে ভরে এগোতে লাগলাম । অভি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমার উত্তরের অপেক্ষা করল । আমি কোন উত্তর না দিয়ে হেটে চলেছি সেই উত্তরের ঘন জঙ্গলটার দিকে । হাটতে হাটতে বললাম, ‘তোর পেছনে কে দাঁড়িয়ে দেখ ।’ অভি কোনো কিছু না দেখে “ও মাগো” বলে ছুটতে লাগলো আমার দিকে । হাপাতে হাপাতে বলল, ‘আজ যদি জ্যান্ত ফিরে যাই দুজনেই, তাহলে তোর কপালে দুঃখ আছে ।’

কিন্তু এখন কেমন গা ছমছম করছে । মনে হচ্ছে কেউ যেন লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের দেখছে, কেউ যেন আমাদের সাথেই হাটছে ।

আমি বললাম, ‘ অভি এর পর সাথে সাথেই হাটবি, পিছিয়ে পড়বি না ।’

কোনো এক অজানা ভয় আমাকে কুড়ে খাচ্ছে । ভয়ে ভয়ে একটু একটু করে এগোচ্ছি । এভাবে মিনিট চল্লিশ হাঁটার পর সামনে কিছু দেখে  থমকে দাঁড়িয়ে দুজনেই হা করে তাকিয়ে আছি । এত ঘন জঙ্গলের মাঝে ফাঁকা জায়গা ! মাঠের মতো পুরো সমতল বিশাল ফাঁকা জায়গা, অবাক করার মতো । বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই । কেও যেন রোজ পরিষ্কার করে । মাঠের মাঝের ঘাসটা যেন প্রচন্ড তাপে ঝলসে গেছে । আমি দৌড়ে গেলাম মাঠের মাঝখানে । সাথে অভিও ।

অভি বলল, মঙ্গল মাঝি তো বলেছিল এখানে কেউ আসেনা, তবে কি !

অভি আমাদের ছুটি বাড়িয়ে দিতে হবে । বেশ কয়েক দিন থাকতে হবে অযোধ্যায় । রহস্যময়ী অযোধ্যার অজানা রহস্য আমাকে জানতেই হবে । এখানে এমন কিছু চলছে যা সবার অজনা, সাধারণ মানুষের অলক্ষে । তুই সাথে থাকবি তো ?

বোতলের জল খেতে অভি বলল হুম ।

কিন্তু ভয় হচ্ছে, যাদের স্বাধীন প্রাঙ্গনে আমরা অনধিকার প্রবেশ করেছি তারা কি আমাদের ছেড়ে দেবে ? এতদিন তারা এই জঙ্গলকে দুর্ভেদ্য করে রেখেছিল । আজ হঠাৎ আমরা তাদের মুক্তাঙ্গনে । বিপদের সম্ভাবনা প্রবল । বেঁচে ফেরার আশা প্রায় নেই । অভি এসবের তোয়াক্কা না করে মাঠের ঘাসে শুয়ে হাত পা ছড়িয়ে আরাম করছে । ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখিন হতে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছি আমি । অপেক্ষা করছি তাদের ।

— শুভ্রজিত মুদি

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of